ঢাকা-লন্ডন রুটে প্রতি ফ্লাইটে ৩ কোটি টাকা গচ্চা দিচ্ছে বিমান

ড্রিমলাইনার হংস বলাকা দিয়ে ১০ ডিসেম্বর থেকে ঢাকা-লন্ডন রুটে সপ্তাহে ছটি ফ্লাইট অপারেট করার সিডিউল ঘোষণা করেই ঢাকঢোল পিটিয়ে টিকেট বিক্রি করা হয়েছে। এতে সাড়াও পড়ে। ২৭১ আসনের অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনারে চড়ার শখে অনেকেই টিকেট কেনেন হুমড়ি খেয়ে। কিন্তু, বিধি বাম! পাইলটের অভাবে মাত্র তিনটি ফ্লাইট অপারেট করার পরই তা বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে এখন সেই আগের নিয়মে সুপরিসর ৪১৯ আসনের ৭৭৭ দিয়ে সপ্তাহে ছটি ফ্লাইট অপারেট করতে হচ্ছে। তাহলে কি দাঁড়াল? বিমানের অর্থ শাখা জানিয়েছে, ২৭১ আসনের ৬টি ফ্লাইটের যাত্রী বহন করতে হচ্ছে ৪১৯ আসনের বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজ দিয়ে। কম যাত্রীর জন্য বেশি ক্যাপাসিটির উড়োজাহাজ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবেই এই রুটের প্রতি ফ্লাইটে কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে বিমানকে। বিমানের বর্তমান পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা হর্তাকর্তাদের এহেন হঠকারী সিদ্ধান্তের দরুন ১৩ ডিসেম্বর থেকেই এই হিসেবে গত এক মাসেই গচ্চা গেছে ৭২ কোটি টাকা। এটা চলবে আরও। কারণ ড্রিমলাইনারের আসন হিসেবে ৩ মাসের অগ্রিম টিকেট বিক্রি করা হয়েছিল গত নবেম্বর ও ডিসেম্বরে। অথচ বিমানের এহেন হঠকারী ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দরুন এত বড় আর্থিক ক্ষতির জন্য যারা দায়ী তাদের কারোর বিরুদ্ধেই কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। একবার জানতেও চাওয়া হয়নি কারা এমন তুঘলকী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাইলট তৈরি না করেই কেনইবা লন্ডনের সম্রাট বাড়ানো হলো? এ জন্য কাউকে কোন জবাবদিহিও করতে হয়নি। এসব দেখারও কেউ নেই। জবাবদিহিতা, শাস্তি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া দূরের কথা, উল্টো অযোগ্য ও অথর্ব কর্মকর্তাদেরকে গোপনে গোপনে তাড়াহুড়ো করে পদোন্নতি দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়। বিষয়টি শেষ মুুহূর্তে জানতে পেরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তা স্থগিত করা হয়। এই হচ্ছে বিমানের বর্তমান হালচাল। বিমান গত বছর দশ মাসই লোকসান গুনেছে এ ধরনের তুঘলকী ও হঠকারী সিদ্ধান্তের দরুন। জানতে চাইলে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক

এম মোসাদ্দিক আহমেদ বলেছেন, এখন এই সিজনটা এমনিতেই একটু মন্দা। লন্ডনে এডহক ভিত্তিতে মাত্র দেড় মাসের জন্য সপ্তাহে ৬টি করে সম্রাট নেয়া হয়েছিল, যা ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তখন আর এতটা ক্ষতি হবে না। আর সত্যি কথা বলতে কি, এখন ঢাকা থেকে কিছু সিট খালি গেলেও লন্ডন থেকে ফিরছে বেশ ভালই।

বিমান জানিয়েছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রথম ড্রিমলাইনার আকাশবীণা ও ২০ নবেম্বর দ্বিতীয় ড্রিমলাইনার হংস বলাকা বিমানবহরে যোগ দেবে, এটা ছিল তিন বছর আগের পরিকল্পিত ও নির্ধারিত। এ দুটো আসার পরই লন্ডনে সপ্তাহে ৪টি ফ্লাইটের স্থলে আরও দুটো বাড়িয়ে ৬টি করা হবে, সেটাও ছিল অন্তত এক বছর আগের সিদ্ধান্ত। সেভাবেই টিকেটও বিক্রি করা হয়েছিল। শুরুটাও হয়েছিল। কিন্তু মাত্র তিনটা ফ্লাইট পরিচালনার পরই তা বন্ধ করে দেয়া হয়। কেন বন্ধ করা হয়? বিমান জানিয়েছে, পাইলট নেই। এ দুটো ড্রিমলাইনারেরর জন্য সঠিক সময়ে পাইলট তৈরি করতে পারেনি ফ্লাইট অপারেশন শাখা। ওই শাখার পরিচালক ক্যাপ্টেন ফারাহাত জামিল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুটো ড্রিমলাইনারের জন্য অন্তত দুই সেট অর্থাৎ ২৪ পাইলট দরকার। বর্তমানে আছে ১৪ জন। সেজন্য ঘোষণা দিয়ে ড্রিমলাইনার দিয়ে লন্ডন ফ্লাইট চালুর পরও তা বন্ধ করতে হয়েছে। এ জন্য দায়ী কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। আর বাপা জানিয়েছে, পাইলট তৈরি করার সব দায়দায়িত্ব ফারাহাতের। তিনি কেন পারেননি সেটা তাকেই জবাবদিহি করতে হবে। বাপার এক সদস্য বলেন, ড্রিমলাইনারের জন্য সঠিক সময়ে পাইলট তৈরি করার দায়িত্ব ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের। এর আগে যখন বোয়িং ৭৭৭ আনা হয় তখন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে প্রয়োজনীয় বিদেশী ইন্সট্রাক্টর ও পাইলট এনে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বিমানের নিজস্ব পাইলটদের তৈরি করা হয়েছিল। যে কারণে তখন এ নিয়ে একদিনও কোন জটিলতা দেখা দেয়নি। বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজের প্রশিক্ষণ বিমান সুচারুভাবে নিতে পেরেছিল। কিন্তু ড্রিমলাইনার আগমনের ক্ষেত্রে কাজটি তারা সঠিকভাবে করতে পারেনি। ওই কাজটা এবার করতে পারেনি বর্তমান পরিচালক ফারাহাত জামিল। তিনি নিজের পছন্দ ও অপছন্দের পাইলটদের নিয়ে নোংরা রাজনীতি করতে গিয়ে এই কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করেন। এটা জেনেও বিমানের সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এ বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ আশীষ রায় চৌধুরী বলেন- ড্রিমলাইনারের জন্য পাইলট তৈরি করতে না পারার ব্যর্থতা বিমানের পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টকে নিতে হবে। এ দায় তারা এড়াতে পারে না। ফ্লাইট অপারেশন শাখার পরিচালকের পদে যিনি আছেন, তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর হাঙ্গেরিগামী ফ্লাইটে ভয়াবহ যান্ত্রিক ত্রুটির পর গোয়েন্দা তদন্তে আপত্তিকর মন্তব্য ছিল। তারপরও তাকে বহাল তবিয়তে রাখা হয়েছে। তবে ফ্লাইট অপারেশন শাখা সূত্র জানিয়েছে, বাপার নেতৃত্বে থাকা বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত পাইলটদের নোংরা রাজনীতির কারণে লন্ডন ফ্লাইট নিয়ে এহেন জটিলতা দেখা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, দূরপাল্লার ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা থেকেই বিমান বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার কেনার চুক্তি করেছিল ২০০৮ সালে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এটি ঢাকা-লন্ডন রুটে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যক বৈমানিককে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে না পারায় আগের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে বিমান। এই মুহূর্তে প্রশিক্ষাণার্থী বৈমানিকরা তাদের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই ঢাকা-ব্যাঙ্কক, ঢাকা-কুয়ালালামপুরে রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছেন।

এ বিষয়ে আশীষ রায় চৌধুরী বলেন, লন্ডন রুট হচ্ছে সবচেয়ে দূরপাল্লার রুট। কোন যাত্রীকে ঢাকা থেকে লন্ডনে যেতে টানা ১১ঘণ্টা ফ্লাই করতে হয়। রুট বিবেচনায় এটি বিমানের লাভজনক রুট। তাছাড়া যে মানের যাত্রীরা এই রুটে যাতায়াত করেন তারা নিয়মিত যাত্রী। ড্রিমলাইনারে ফ্লাই করলে একজন যাত্রী কেবিনে ৬,০০০ ফিট উচ্চতায় চড়লে যে আরামদায়ক ভ্রমণের আনন্দ পান তা-ই পাবেন। আর বোয়িং ৭৭৭-এর ক্ষেত্রে তা হবে ৮,০০০ ফিট। এসব বিবেচনায় লাভজনক এবং অভিজাত রুটেই ড্রিমলাইনার দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা উচিত। কিন্তু বিমানের বর্তমান নেতৃত্ব এই সহজ বাস্তবতাটাই বুঝতে পারছে না। এদের কাছ থেকে এমনটা প্রত্যাশাও বোকামি।

সূত্রঃ জনকণ্ঠ।


 

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.