অযোগ্য পাইলট নিয়োগ নিয়ে প্রশ্নের মুখে বিমান

যাত্রী নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে?

অযোগ্য পাইলট নিয়োগ নিয়ে প্রশ্নের মুখে বিমান বাংলাদেশ: যাত্রী নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে?

বিশেষ প্রতিনিধি : কল্পনা করুন, আপনি পরিবার-পরিজন নিয়ে টরন্টো থেকে ঢাকাগামী বাংলাদেশ বিমানের Boeing 777-300ER এ যাত্রা করছেন। প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টার দীর্ঘ এই ফ্লাইটে আপনার সঙ্গে রয়েছেন আরও চার শতাধিক যাত্রী। অথচ মাঝ আকাশে জানতে পারলেন, বিমানটি পরিচালনা করছেন এমন একজন পাইলট যার যোগ্যতা নিয়েই রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। তখন কি আপনি নিজেকে নিরাপদ মনে করবেন?

বেশ কিছুদিন আগে  বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে পাইলট নিয়োগ ও লাইসেন্স জালিয়াতি নিয়ে ওঠা একাধিক অভিযোগ জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে অযোগ্য বা অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া পাইলটদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার অভিযোগ যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

২০২২ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) বিমান বাংলাদেশের ১৪ জন পাইলট নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন করে। অভিযোগ ছিল, নিয়োগ নীতিমালা লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক প্রভাবে অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ওই ঘটনায় তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে এবং পরে তাকে পদত্যাগ করতে হয়।

এরপর ২০২৬ সালে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসে। কয়েকজন সিনিয়র পাইলট জাল ফ্লাইট রেকর্ড ব্যবহার করে লাইসেন্স অর্জন করেছেন বলে অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে আসে। তদন্তে অন্তত পাঁচজন পাইলটের লাইসেন্সে অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া যায়। এদের মধ্যে ক্যাপ্টেন মেহেদী ইসলাম ও ক্যাপ্টেন সাদিয়া আহমেদের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ক্যাপ্টেন সাদিয়া আহমেদ জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে পাইলট লাইসেন্স ও চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি নিজেকে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে দাবি করলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, তিনি মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। অথচ বাংলাদেশে Commercial Pilot Licence (CPL) পাওয়ার জন্য Physics ও Mathematicsসহ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা বাধ্যতামূলক।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, Boeing 777 পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় flying hours পূরণ না করেই তিনি উড্ডয়নে অংশ নেন। তদন্তে আরও উঠে আসে, তার স্বামী ক্যাপ্টেন সাজিদ আহমেদের প্রভাব ব্যবহার করে তাকে চাকরি পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বিমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন training chief ক্যাপ্টেন সাজিদ আহমেদ কৃত্রিমভাবে “pilot crisis” তৈরি করেছিলেন, যাতে তার স্ত্রীকে contractual pilot হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যায়।

পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন সাদিয়া আহমেদকে প্রথমে grounded করা হয়। পরে তার CPL ও PPL লাইসেন্স স্থগিত করা হয় এবং শেষে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB) তার লাইসেন্স বাতিল করে। তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অনেক অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, অথচ অধিক যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমান পরিচালনায় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। একজন পাইলটের সামান্য ভুলও শত শত যাত্রীর জীবনের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই নিয়োগে অনিয়ম বা জালিয়াতির অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক দুর্নীতির বিষয় নয়, এটি সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যদি এসব অভিযোগ সামনে না আসত এবং অভিযুক্তরা এখনও আন্তর্জাতিক রুটে বিমান পরিচালনা করতেন, তাহলে যাত্রীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত থাকত?

অনেকের মতে, আকাশপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিমান খাতে স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.

EN