পাসপোর্ট সেবায় বড় সমস্যা দালাল আর পুলিশ ভেরিফিকেশন

passport‘নির্দিষ্ট সময়ে পাসপোর্ট না পেয়ে আমি প্রতিদিনই পাসপোর্ট অফিসে গেছি। এর কাছে, ওর কাছে গেছি। কিন্তু পাই নাই। এক স্যারের কাছে অনেক অনুনয়-বিনয় করেছি। বোনের অসুস্থতার কথা বলেছি। কিন্তু কোনো সহায়তা পাই নাই। একপর্যায়ে আমাকে ওই স্যার বললেন, ‘‘তোমার বোনরে হাসপাতালে নিয়া শোয়ায়ে রাখো।’” অসুস্থ বোনের পাসপোর্ট করাতে নিজের বিড়ম্বনার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন সাভারের আরিফুল ইসলাম।

বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানিতে এ কথা বলেন আরিফুল। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি মিলনায়তনে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

অসুস্থ বোনের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন। গত ৯ জুন ঢাকার পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করেছিলেন সাভারের আরিফুল ইসলাম। ২২ জুন পাসপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও পাননি। ১০ জুলাই পাসপোর্ট হাতে পান তিনি। জরুরি ফি দিয়ে সাত কর্মদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়ার কথা থাকলেও তিনি পেয়েছেন এক মাস পর। আরিফুল বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ে পাসপোর্ট না পেয়ে বোনকে বাইরে নিতে পারিনি। সে এখন মৃত্যুশয্যায়।’

গণশুনানিতে আরিফুলের মতো আরও ২৬ জন ভুক্তভোগী তাঁদের হয়রানির কথা তুলে ধরেন। ভুক্তভোগীর কথায় উঠে আসে দালালের দৌরাত্ম্য আর পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে হয়রানির কথা। পাসপোর্ট বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসহযোগিতা, কাজের দীর্ঘসূত্রতা, ভেতরের পরিবেশসহ নানা বিষয়ও উঠে আসে।

এসব বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ রিজওয়ান এবং পাসপোর্ট অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ওই সব বিষয়ে তাঁদের মতামত ও বক্তব্য দেন।

মিরপুরের রূপনগরের মনির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ছোট ভাইয়ের নাম সংশোধন করতে গিয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় ঢাকার ঠিকানায় পাওয়া যায়নি বলে নেতিবাচক প্রতিবেদন জমা দেন পুলিশ কর্মকর্তা। পরে নতুন করে ভেরিফিকেশনের সময় মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বরে দেখা করে টাকা নিয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন দেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। আরও কয়েকজন ভুক্তভোগীও পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে জটিলতার কথা তুলে ধরেন।

এ সময় দুদক চেয়ারম্যান বলেন, পাসপোর্ট ইস্যু, পাসপোর্ট নবায়ন কিংবা পাসপোর্ট সংশোধনের ক্ষেত্রে পুলিশি ভেরিফিকেশন সম্পৃক্ত ভোগান্তি লাঘবে অপরাধীদের তালিকা পাসপোর্ট অধিদপ্তরে থাকা উচিত। তিনি বলেন, ‘সবাই তো অপরাধী নয়। তাহলে ভেরিফিকেশন জরুরি কেন?’ তিনি জানতে চান, পুলিশ ভেরিফিকেশনের বিষয়টি সরলীকরণ করা যায় কি না? পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মাসুদ রিজওয়ান জানান, সময় নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। ওই সময়ের মধ্যে পুলিশের প্রতিবেদন না পেলে পাসপোর্ট দিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে। অনলাইনে পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে আসা যায় কি না, সে বিষয়েও ভাবা হচ্ছে।
এর আগে স্বাগত বক্তব্যে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনে হয়রানি হয়। তারা টাকা ছাড়া কাজ করে না। আমরা আশা করব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টা খতিয়ে দেখবে।’ তিনি বলেন, দালালদের জন্যই পাসপোর্ট অফিসের বদনাম হয়। পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে দালালমুক্ত করতে হবে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মাসুদ রিজওয়ান বলেন, ‘সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদেরও কিছু গাফিলতি আছে, সেটা আমি অকপটে স্বীকার করছি।’ তবে গত কয়েক মাসে পাসপোর্ট বিভাগে সেবার ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি জানান, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশনের সহায়তায় অনলাইনে ফরম পূরণের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। সত্যায়নের বিষয়টি তুলে দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.