ইউনূস সরকারের চুক্তির ধারায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজের জন্য খুলছে বন্দর?
জিসোমিয়া ও আকসা চুক্তি কিংবা বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারে মার্কিন সামরিক সুবিধা প্রসঙ্গে সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য বা ঘোষণা দেয়নি।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ‘জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (জিসোমিয়া) এবং ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ (আকসা) ঘিরে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশকে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) নামে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একটি ধারা পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লেখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ব্যক্তিগত চিঠিতেও জিসোমিয়া ও আকসা চুক্তির প্রসঙ্গ উঠে আসে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে। যদিও এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, আকসা চুক্তি কার্যকর হলে মার্কিন সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের বন্দর ও বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে জ্বালানি সংগ্রহ, রসদ সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ীর মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে জিসোমিয়া চুক্তি মূলত সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই দুই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে। একইসঙ্গে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জ্বালানি ও বাণিজ্য করিডোরে নজরদারির সুযোগও বাড়তে পারে।
ইউক্রেনভিত্তিক সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘মিটিলাটিরিনি’ সম্প্রতি “মার্কিন যুদ্ধজাহাজের জন্য বন্দর খুলে দিচ্ছে বাংলাদেশ” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি দেশটির ভূরাজনৈতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে চীনের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশই চীন থেকে আমদানি করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এসব প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে চীনের বিকল্প জ্বালানি ও বাণিজ্য রুট ব্যবহারের পরিকল্পনা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট নয়। জিসোমিয়া ও আকসা চুক্তি কিংবা বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারে মার্কিন সামরিক সুবিধা প্রসঙ্গে সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য বা ঘোষণা দেয়নি।
