দীর্ঘ ছয় বছর পর জাগছে আশা: চালুর পথে শ্যামপুর সুগার মিল?

দীর্ঘ ছয় বছর পর জাগছে আশা: চালুর পথে শ্যামপুর সুগার মিল?
সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, মন্ত্রীর আশ্বাস, কমিটির সুপারিশ ও স্থানীয় দাবির মুখে নতুন আলো দেখছে উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শিল্পপ্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারও আলোচনায় এসেছে রংপুরের বদরগঞ্জে অবস্থিত শ্যামপুর সুগার মিল। এক সময় উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ইতিবাচক আলোচনা, সংসদে মন্ত্রীর বক্তব্য, বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ এবং স্থানীয় জনমতের চাপ নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
২০২০ সালে লোকসান ও উৎপাদন সংকটের অজুহাতে দেশের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের সঙ্গে শ্যামপুর সুগার মিলের উৎপাদন কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে শত শত শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং হাজারো আখচাষি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্ধ হয়ে যায় একটি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। দেশে চিনি আমদানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রশ্ন সামনে আসায় সরকার পুনরায় রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

সংসদে মন্ত্রীর আশ্বাস
জাতীয় সংসদে একাধিক প্রশ্নোত্তর পর্বে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জানিয়েছেন, শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ সুগার মিল পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকার ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, মিলগুলো আধুনিকায়ন এবং অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ধাপে ধাপে পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে এবং পুনরায় চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কমিটির সুপারিশে শ্যামপুর অগ্রাধিকার তালিকায়
বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স বন্ধ চিনিকলগুলো পর্যালোচনা করে শ্যামপুর সুগার মিলকে পুনরায় চালুর জন্য অগ্রাধিকারযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উত্তরাঞ্চলে এখনও পর্যাপ্ত আখ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকদের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে মিলটি লাভজনকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে নতুন গতি
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে নীতিগত আলোচনা শুরু হয়। তখন থেকেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ অকার্যকর অবস্থায় না রেখে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সেই সময় থেকেই শ্যামপুর সুগার মিলসহ বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকারের নীতিগত আলোচনার ভিত্তি তৈরি করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল গঠনের উদ্যোগ
শিল্প পুনরুজ্জীবনে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন ও বিশেষ তহবিল গঠনের বিষয় বিবেচনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করতে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে শুধু শ্যামপুর নয়, দেশের অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাও নতুন জীবন পেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গুরুত্ব পেয়েছে বন্ধ শিল্প
বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বন্ধ চিনিকল, পাটকল এবং অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে শ্যামপুর সুগার মিলের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।

স্থানীয় জনমত ও রাজনৈতিক চাপ
শ্যামপুর সুগার মিল চালুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান এবং জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও দাবি করে আসছেন, মিলটি চালু হলে শুধু কর্মসংস্থানই বাড়বে না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি চাঙা হবে। আখচাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে।

দেশে চিনির চাহিদা বাড়ছে
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ চিনি আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি ও ডলারের চাপের কারণে আমদানিনির্ভরতা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরায় চালু করা গেলে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানির ওপর চাপ কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আশার আলো, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়
যদিও শ্যামপুর সুগার মিল পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকারের অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ইতিবাচক, তবুও অর্থায়ন, আধুনিকায়ন, আখ সরবরাহ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
তবে মন্ত্রীর আশ্বাস, বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, স্থানীয় জনমত এবং দেশের ক্রমবর্ধমান চিনির চাহিদা—সবকিছু মিলিয়ে শ্যামপুর সুগার মিল আবারও উৎপাদনে ফেরার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন অপেক্ষা শুধু চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.