বাংলাদেশ বিমানে নতুন ডিএফওর আদেশ বাতিল

বাংলাদেশ বিমানে নতুন ডিএফওর আদেশ বাতিল।

ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবকে পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন (ডিএফও) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়ার আদেশ বাতিল করেছে বিমান। রোববার বিমানের ম্যানেজার পার্সোনাল নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ বাতিলের কথা জানানো হয়। রহস্যজনক কারণে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায় ওই আদেশ প্রত্যাহার করা হল।
এর আগে ১১ জুলাই বাসিত মাহতাবকে পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
বিমানের পক্ষ থেকে এ ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে রোববার সন্ধ্যায় বিমানের মুখপাত্র (ডিজিএম জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকারের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন আদেশ প্রত্যাহারের কারণ। তারা আলাদাভাবে বলেন, বাসিত মাহতাবকে ডিএফও হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি বিমান পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) একটি অংশ। বাপার এ অংশটির চাপের মুখে বিমান সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।
১১ জুলাই নতুন ডিএফওর আদেশ জারির সঙ্গে সঙ্গে বাপার ওই অংশটির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। বলা হয়, জুনিয়র ক্যাপ্টেনকে বিমানের ডিএফও হিসেবে তারা মেনে নেবেন না। এতে পাইলটদের মধ্যে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়বে। তারা অবিলম্বে এ আদেশ বাতিল করে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ডিএফও নিয়োগ দেয়ার কথা জানান। একই সঙ্গে এ আদেশ প্রত্যাহার না করলে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকি দেয়া হয়।
এজন্য বিমান ম্যানেজমেন্টকে ৪৮ ঘণ্টার সময়ও বেঁধে দেয়া হয়। আলটিমেটামের পার্ট হিসেবে বাপার অংশটি রোববারের ঢাকা-লন্ডন ফ্লাইটকে বেছে নিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ম্যানেজমেন্ট যাতে কোনোভাবেই ওই ফ্লাইট পরিচালনা করতে না পারে সেজন্য এক রাতে পরপর ৩ জন সিনিয়র পাইলট নিজেকে অসুস্থ ঘোষণা করেন।
শনিবার রাতে যখন নতুন ডিএফও ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের নেতৃত্বে বিমানের সিডিউলিং বিভাগ ঢাকা-লন্ডন ফ্লাইটের জন্য পাইলট ও কো-পাইলটের নাম ঘোষণা করেন তখনই একে একে পাইলটরা নিজদের সিক ঘোষণা করতে থাকেন। সন্ধ্যায় প্রথমে ওই ফ্লাইটের জন্য পাইলট হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় ফ্লাইট সেফটি ও ট্রেনিং বিভাগের দু’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার (যারা পাইলট) নাম।
এদের একজন সম্প্রতি পাসপোর্ট কেলেঙ্কারিতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। প্রথমে তিনিই নিজকে সিক ঘোষণা করেন।
এরপর স্ট্যান্ডবাই হিসেবে থাকা সেফটি বিভাগের সিনিয়র পাইলটও নিজকে সিক ঘোষণা করেন। বাধ্য হয়ে সিডিউলিং বিভাগ ঢাকা-দোহা ফ্লাইটের জন্য নির্ধারিত থাকা একজন সিনিয়র পাইলটকে দোহা রুট থেকে প্রত্যাহার করে লন্ডন ফ্লাইটের জন্য সিডিউল দেন। এ ঘোষণার কিছুক্ষণ পর ওই পাইলটও রহস্যজনক কারণে নিজকে সিক ঘোষণা করেন।
শেষ পর্যন্ত পাইলট সংকটের কারণে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মাত্র ১ জন ক্যাপ্টেন দিয়ে ওই ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এতবড় ঝুঁকি নিয়ে ১১ ঘণ্টার ঢাকা-লন্ডন ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেয়া ঠিক হয়নি। নির্ধারিত সময় থেকে ২ ঘণ্টা দেরিতে লন্ডনে উড়াল দিতে হয়েছে ঢাকা-লন্ডন ফ্লাইট।
বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘বাপার’ চাপের মুখে বিমান বোর্ড শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিমান ম্যানেজমেন্টের এক শীর্ষ কর্মকর্তার ইন্ধনে বাপার একটি অংশ এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে ওই কর্মকর্তা এখন দুটি বড় বিভাগের প্রধান হিসেবে থাকার সুযোগ পেয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, যদি এ আদেশ প্রত্যাহার না করা হতো তবে চলতি হজ ফ্লাইটে একের পর এক পাইলট নিজদের (সিক) অসুস্থ ঘোষণা করতেন। এতে হজ ফ্লাইট নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতো।
সিভিল এভিয়েশনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বিমানের ঢাকা-লন্ডনের সরাসরি ফ্লাইটটি ১১ ঘণ্টার। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একজন পাইলট টানা ৮ ঘণ্টার বেশি ফ্লাইট করার সুযোগ পাবেন না। যদি কোনো কারণে ফ্লাইট করতে হয় তবে সংশ্লিষ্ট দেশের রেগুলেটরি কমিশনের অনুমতি নিতে হয়।
যেহেতু বিমানের ওই ফ্লাইট ১১ ঘণ্টার সেজন্য ঢাকা-লন্ডন-ঢাকার প্রতিটি ফ্লাইটে ২ জন ক্যাপ্টেন ও একজন কো-পাইলট দেয়া হয়। এতে বিশ্রাম নিয়ে পাইলটরা ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ পান। কিন্তু রোববার বিমানে লন্ডন ফ্লাইট করার মতো সিনিয়র পাইলট ছিলেন না সেহেতু বাধ্য হয়ে ১ জন পাইলট দিয়েই ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয়েছে।
অভিযোগ আছে, লন্ডন ফ্লাইটে যে পাইলট প্রথমে নিজকে রহস্যজনক সিক ঘোষণা করেন তিনি ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের একটি শাখার শীর্ষ পদে থাকায় ম্যানেজমেন্টের কোনো নির্দেশনাই কেয়ার করেন না। বিমান ম্যানেজমেন্টর এক শীর্ষ কর্মকর্তা (পাইলট) তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় তিনি কোনো আইনেরও তোয়াক্কা করেন না।
এর আগেও তার বিরুদ্ধে দফায় দফায় অভিযোগ উঠলেও ম্যানেজমেন্ট কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সপ্তাহে নির্দিষ্ট ঘণ্টার বেশি ফ্লাইট করার নিয়ম না থাকলেও তিনি আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে সপ্তাহে ঢাকা-লন্ডন রুটে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করেন। এতে সপ্তাহে ওই পাইলটের ৪৪ ঘণ্টার বেশি ফ্লাইট হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন আইন অনুযায়ী এটি বড় ধরনের অপরাধ। কিন্তু তারপরও দেশের রেগুলেটরি কমিশন সিভিল এভিয়েশন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

সূত্রঃ যুগান্তর

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.