দেশি এয়ারলাইন্সগুলো করোনার আঘাতে টিকে থাকতে চায় সরকারের সহায়তা

দেশি এয়ারলাইন্সগুলো করোনার প্রভাবে বিভিন্ন রুটে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করেছে । তবে উড়োজাহাজের লিজের টাকা, কর্মীদের বেতন, পার্কিং চার্জ, উড়োজাহাজ মেরামতসহ অন্য ব্যয় নিয়মিতই করতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

এই সংকটময় পরিস্তিতিতে দেশি এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংকটকালে তাই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এরোনটিক্যাল, নন-এরোনটিক্যাল চার্জ মওকুফসহ সরকারের নীতিগত সহায়তা চায় উড়োজাহাজ প্রতিষ্ঠানগুলো।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, নভোএয়ার, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ এ চারটি দেশি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে ২৫ মার্চ থেকে দেশের অভ্যন্তরের সাতটি গন্তব্যে ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে, যা ৭ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের ও বাংলাদেশের বিধিনিষেধের কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও বন্ধ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের। শুধু ইউএস-বাংলা চীনে সপ্তাহে একটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও উড়োজাহাজ লিজের টাকা, উড়োজাহাজ মেরামত, কর্মীদের বেতন, ব্যাংক লোন, উড়োজাহাজ পার্কিংসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এরোনটিক্যাল, নন-এরোনটিক্যাল চার্জ দিতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক)।

প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে- বেবিচকের সব ধরনের এরোনটিক্যাল, নন-এরোনটিক্যাল চার্জ ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত মওকুফ করা। ব্যাংক ঋণের কিস্তি দুই প্রান্তিকে সুদবিহীনভাবে ডেফারেড পেমেন্টের ব্যবস্থা করা। উড়োজাহাজ, ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে আরোপিত অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা। অভ্যন্তরীণ খাতের জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক ও ভ্যাট রহিত করা।

এ প্রসঙ্গে এওএবির মহাসচিব এবং নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, এখন সব এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বন্ধ, কোনও আয় নেই। কিন্তু কিছু অত্যাবশ্যকীয় খরচ আছে, যা আমাদের করতেই হচ্ছে। দেশি এয়ারলাইন্সগুলো এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনও পড়েনি। এয়ারলাইন্সগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের পদক্ষেপ দরকার। আমরা এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কিছু প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছি।

আগে থেকে সংকটে থাকা রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ইতোমধ্যে তিন মাসের জন্য তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। এয়ারলাইন্সটির কর্মীদের তিন মাসের বিনাবেতনে ছুটি দেওয়া হয়েছে। শুধু বেবিচকের বিভিন্ন ফি বাবদ ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এয়ারলাইন্সটির বকেয়া ২৩৬ কোটি টাকা। লিজে নেওয়া নিজেদের দুটি উড়োজাহাজও ফেরত দেবে এয়ারলাইন্সটি।

এ প্রসঙ্গে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ বলেন, করোনার প্রভাবে আমরা আন্তর্জাতিক যেসব রুটে ফ্লাইট চালাতাম তা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব রুট আবার কবে চালু হবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। এ কারণে পরিস্থিতি বিবেচনা করে ৩ মাসের জন্য ফ্লাইট পরিচালনা কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ সময়টা আরও কমতেও পারে, আবার বেড়েও যেতে পারে। কর্মীদেরও তিন মাসের লিভ উইথআউট পে’র বিষয়টি চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। প্রতি মাসে আমাদের কর্মীদের বেতন বাবদ পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়, উড়োজাহাজ লিজ বাবদ আরও ১০ কোটি টাকা খরচ হয়। অন্যান্য আরও খরচ তো আছেই।

শাহজালাল বিমানবন্দরে পার্কিং করা দেশি এয়ারলাইন্সগুলোর উড়োজাহাজবর্তমানের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দেশি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য সরকারের নীতিগত সহায়তা চান ইমরান আসিফ। তিনি বলেন, আমরা সরকারের কাছে কোনও টাকা-পয়সা চাই না। কিন্তু যেসব চার্জ আমাদের দিতে হয়, যেসব জায়গায় ফি দিতে হয়, সে সবে ছাড় না দিলে দেশি এয়ারলাইন্সগুলোর ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

করোনায় সংকটে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও। আয়হীন এ সময়ে খরচ কমাতে নানা সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এরইমধ্যে বিমানের কর্মীদের ওভারটাইম সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পাইলট ও কেবিন ক্রুদের মূল বেতনের ১০ শতাংশ কাটার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। নির্বাহী পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও সমমান মর্যাদার কর্মকর্তারা বর্তমানে যে হারে আপ্যায়ন ভাতা পেতেন, তার ৫০ শতাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে মার্চ মাস থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, করোনার প্রভাব এখন সবখানে। আমাদেরও যেসব খাত থেকে আয় হতো, সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এসব আয় দিয়েই আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চাঁদা দিতে হয়। তবে এ মুহূর্তে আমরা এসব বিষয় নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেইনি। তবে এসব বিষয় আমরা বিবেচনা করবো।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, এয়ারলাইন্সগুলোর প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাদের কতটা সহায়তা করা যায় আমরা বিবেচনা করবো।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.