বড় উড়োজাহাজের দিন শেষ হচ্ছে কি?

পিনাল এয়ার পার্ক অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ফিনিক্সের ৯০ মাইল দক্ষিণে

শহর মারানায়।
অ্যারিজোনা মরুভূমির মাঝখানে অবস্থিত বিমানবন্দরটিতে রানওয়ে আছে একটি।
কোনো প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল নেই। বিমানবন্দরটি আসলে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য স্থাপন

করা হয়নি।
পুরনো অচল হয়ে পড়া উড়োজাহাজ, যেগুলোর আর কখনো আকাশে উড্ডয়নের সম্ভাবনা নেই; সেগুলোরই শেষ ঠাঁই

হয় এখানে।
এ কারণেই উড়োজাহাজ শিল্পসংশ্লিষ্টদের কাছে এটি পরিচিত এয়ারক্রাফট বোনইয়ার্ড বা উড়োজাহাজের গোরস্থান হিসেবে।

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই এখানে নতুন কিছু বাসিন্দার আগমন দেখা যাচ্ছে।
নতুন করে বেশকিছু বিশালদেহী উড়োজাহাজ এনে জড়ো করা হয়েছে এখানে, যেগুলোকে অচল বলা চলে না কোনোভাবেই।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে করোনার ধাক্কা উড়োজাহাজগুলোকে চলাচলের রুট থেকে ছিটকে এনে ফেলেছে এয়ারক্রাফটগুলোতে।
বিশালায়তনের এসব ওয়াইড-বডি প্লেন আবার কবে আকাশে উড়বে, সে বিষয়ে এখনো কোনো ধারণা নেই কারো।
যদি আবার আকাশে ওড়ার আগেই এখানে চিরস্থায়ী হয়ে পড়ে উড়োজাহাজগুলো, সেক্ষেত্রে তা রূপ নেবে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে খারাপ দুঃস্বপ্নে।

বর্তমানে বৈশ্বিক উড়োজাহাজ বহরের বড় একটি অংশ পড়ে রয়েছে গ্রাউন্ডেড অবস্থায়।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় গভীর সংকটে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচল খাত।
বিশেষ করে নিজ নিজ বহরের ওয়াইড-বডি জেট নিয়ে ব্যাপক বিপাকের মধ্যে রয়েছে এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানগুলো।

ওয়াইড-বডি প্লেন বলতে বোঝায় সবচেয়ে বিশালায়তনের উড়োজাহাজগুলোকে। এসব জেট উড়োজাহাজের ফিউসিলাজ (ডানার অংশ বাদ দিয়ে মূল বডি) পাশাপাশি কমপক্ষে সাতটি আসনে যাত্রী পরিবহনে সক্ষম।
যাত্রী সারির মাঝখানে দুটি আইল থাকায় এগুলো টুইন আইল এয়ারক্রাফট নামেও পরিচিত।
সবচেয়ে পরিচিত ওয়াইড-বডি প্লেনগুলোর মধ্যে রয়েছে এয়ারবাস এ৩৩০, এ৩৮০, বোয়িং ৭৬৭, বোয়িং ৭৭৭, লকহিড এল-১০১১ ট্রাইস্টার, ইল্যুশিন আইএল-৮৬ ইত্যাদি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাপী দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহনে ব্যাপক ভাটা পড়েছে এখন।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানগুলো মারানাসহ বিভিন্ন মরুভূমিতে অবস্থিত এয়ার পার্কে নিজেদের উড়োজাহাজগুলো গ্রাউন্ডেড করে রেখেছে। এক্ষেত্রে ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজগুলোই তুলনামূলক ব্রাত্য হয়ে পড়ছে বেশি।

প্রসঙ্গত, উড়োজাহাজ দীর্ঘদিন সচল না রেখে সংরক্ষণ করতে হলে এয়ারলাইনসগুলো সাধারণত মরুভূমির উষ্ণ আবহাওয়াকেই বেছে নেয়। এসব এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানের মূল হাব হিসেবে পরিচিত বিমানবন্দরগুলো তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ার অঞ্চলগুলোয় অবস্থিত হওয়ায় সেখানে দীর্ঘদিন বসিয়ে রাখা হলে এসব উড়োজাহাজের অকেজো হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই উড়োজাহাজ সংরক্ষণের জন্য মরুভূমির সূর্যস্নাত উষ্ণ আবহাওয়াকে বেছে নেয়া হয়।

পিনাল এয়ার পার্কে উড়োজাহাজ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম ডেল্টা এয়ারলাইনস। প্রতিষ্ঠানটির বেশকিছু ওয়াইড-বডি জেট এখন মারানায় গ্রাউন্ডেড করে রাখা হয়েছে। এসব উড়োজাহাজের মধ্যে অধিকাংশই বোয়িং ৭৬৭, ৭৭৭ ও এয়ারবাস এ৩৩০ মডেলের।

মারানার মতো বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এমন বেশকিছু উড়োজাহাজ সংরক্ষণের স্থান রয়েছে। স্পেনের পূর্বাঞ্চলে আরাগোনিয়া প্রদেশের তেরুয়েল শহরে এমনই একটি এয়ার পার্ক পরিচালনা করছে টারমাক অ্যারোসেভ নামে একটি কোম্পানি।

করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই জার্মান এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠান লুফথানসার বিশালদেহী এয়ারবাস এ৩৮০ মডেলের উড়োজাহাজগুলো এখানে এনে জড়ো করা হয়েছে। ইউরোপীয় আরো অনেক এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানই এখানে নিজস্ব বহরের ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ এনে সংরক্ষণ করছে।

বিশ্বব্যাপী এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলমান কভিড-১৯ মহামারী এয়ারলাইনস খাতকে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়তে যাচ্ছে। খাতটির অনেক কিছুতেই পরিবর্তন নিয়ে আসছে মহামারীর অভিঘাত, এমনকি এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানগুলোর উড়োজাহাজ বহরের ধরনেও।

বিনিয়োগ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান কোয়েনের সাম্প্রতিক এক নোটে মার্কিন এয়ারলাইনস খাতসংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলা হয়, উড়োজাহাজ চলাচলের ভবিষ্যৎ হবে আরো ‘ক্ষুদ্রতর ও বেশি কার্যকর’।

অন্যদিকে উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং ও এয়ারবাস নিজ নিজ বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে, মহামারীর ক্ষতি কাটানোর জন্য কৃশকায় ন্যারো-বডি প্লেন উৎপাদনের ওপরই নির্ভর করতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

এ বিষয়ে এয়ারবাসের সিইও গুইলাউমে ফাউরির মন্তব্য হলো বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ ও তা পর্যালোচনার ফলাফল বলছে, বতর্মান ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে নিতে হলে ওয়াইড-বডির তুলনায় সিঙ্গল লাইন প্লেন (তুলনামূলক কৃশ ও ক্ষুদ্রাকৃতির উড়োজাহাজ, ন্যারো-বডি বা সিঙ্গল-আইল প্লেন) বেশি কার্যকর। ওয়াইড-বডির ক্ষেত্রে আমাদের ক্ষতি কাটাতে অনেক বেশি সময় লাগবে।

প্রকৃতপক্ষে পরিচালনার দিক থেকে ন্যারো-বডির ব্যয় কার্যকারিতা ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের চেয়ে অনেক বেশি। একেকটি ন্যারো-বডি উড়োজাহাজে গড়ে ১৪৮ জন করে যাত্রী পরিবহন করা যায়। এসব উড়োজাহাজে ঘণ্টায় জ্বালানি প্রয়োজন হয় ৮৭৬ গ্যালন। অন্যদিকে ওয়াইড-বডি প্লেনগুলোয় গড়ে ২৪৮ জন করে যাত্রী পরিবহন করা যায়। ঘণ্টায় জ্বালানি প্রয়োজন পড়ে ১ হাজার ৯৩৭ গ্যালন। সে হিসেবে ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ তুলনামূলক বেশি জ্বালানিসাশ্রয়ী। এছাড়া অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় ও সংরক্ষণ ব্যয়ের কথা বিবেচনায় নিলেও সামনের দিনগুলোয় ন্যারো-বডি প্লেনের চাহিদাই বেশি হবে বলে মনে করছে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

এ চাহিদা পতনের দিকটি বিবেচনায় নিয়ে এরই মধ্যে ওয়াইড-বডি জেটের উৎপাদন কমিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বোয়িং ও এয়ারবাস। ২০২২ সালের মধ্যে ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে বোয়িং। একই পদক্ষেপ নিয়েছে এয়ারবাসও। চলতি বছর ৪০টি এ৩৩০ মডেলের ওয়াইড-বডি জেট উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত ২৪-এ নামিয়ে এনেছে এয়ারবাস।

দীর্ঘদিন ধরে দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহনে বিকল্পহীন হয়ে উঠেছিল ওয়াইড-বডি জেট। ১৯৬৯ সালে বোয়িং ৭৪৭ মডেলের উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিক এভিয়েশন খাতে রীতিমতো নতুন যুগের সূচনা এনে দেয়। এর ফলে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুলভ হয়ে ওঠার পাশাপাশি ব্যাপকতর হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজে বিদেশ ভ্রমণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যবিত্তের হাতের নাগালে চলে আসে। এ মডেলের উড়োজাহাজের সিটপ্রতি পরিচালন ব্যয়ও ছিল অনেক কম।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে ন্যারো-বডি উড়োজাহাজেরও উন্নয়ন হয় ব্যাপক মাত্রায়। একপর্যায়ে এটির সিটপ্রতি পরিচালন ব্যয় ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের সমান হয়ে ওঠে। ইসরায়েলের জাতীয় এয়ারলাইনস ইআই এআইয়ের তেল আবিব-লস অ্যাঞ্জেলেস বিরতিহীন ফ্লাইট চলাচলে একসময় শুধু ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজই ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ন্যারো-বডির সুযোগ-সুবিধা বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন দূরপাল্লার যাত্রায় ওয়াইড-বডি ব্যবহার প্রায় ত্যাগ করেছে এয়ারলাইনসটি।

অন্যদিকে এয়ারবাস এ৩২১এক্সএলআরের মতো মধ্যমাকৃতির সিঙ্গল আইল উড়োজাহাজেরও উন্নয়ন হয়েছে প্রচুর। এ মডেলের উড়োজাহাজের ফুয়েল ট্যাংকের আকৃতি বড় করতে করতে এটির পাল্লা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭০০ কিলোমিটারে।

তবে এ মুহূর্তে বিশালদেহী জেটের নতুন ব্যবহারের কথাও ভাবছে কেউ কেউ। ডাচ এয়ারলাইনস কেএলএম সম্প্রতি নিজস্ব দুটি বোয়িং ৭৪৭ কম্বিস পুনরায় সচল করার ঘোষণা দিয়েছে, তবে যাত্রীবাহী নয়, কার্গো প্লেন হিসেবে। প্যাসেঞ্জার ডেককে পরিবর্তন করে কার্গো পরিবহনের উপযোগী করে তুলেছে এয়ারলাইনসটি।

অনেকটা একইভাবে ভাবছে এয়ারবাসও, সম্প্রতি উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা দিয়েছে এ৩৩০ ও এ৩৫০ মডেলের উড়োজাহাজগুলোকে প্যাসেঞ্জার সিট তুলে কার্গো পরিবহনের উপযোগী করে তুলতে পারবে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানগুলো।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.