টিকিটের হাহাকার, অথচ মালেশিয়া থেকে খালি সিটে ফিরছে বিমান

টিকিটের হাহাকার, অথচ মালেশিয়া থেকে খালি সিটে ফিরছে বিমান।

মালয়েশিয়া সরকার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায় এরই মধ্যে দেশে ফিরে এসেছেন প্রায় ৪০ হাজার অবৈধ শ্রমিক। কিন্তু টিকিট সংকট ও টিকিটের দাম চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি হওয়ায় ফিরতে পারছেন না ৫০ হাজারের বেশি প্রবাসী। মালয়েশিয়া থেকে অবৈধ শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-মালয়েশিয়া রুটে চলতি মাসে নিয়মিত ফ্লাইটের অতিরিক্ত ১৬টি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তবে যাত্রী বেশি হওয়ায় বিমানের টিকিটের জন্য হাহাকার চলছে। অথচ খালি আসন নিয়ে কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকায় ফিরছে বিমান। প্রতি ট্রিপেই অর্ধশত আসন খালি থাকছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি এয়ারলাইনসের সঙ্গে কারসাজি করে বিমানের টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

আগামী পরশু মঙ্গলবার (৩১ ডিসেম্বর) চার মাসের সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এরপর অবৈধ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলবে। সে দেশের ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে ধরা পড়লে জেল, বেত্রাঘাতের সাজা হবে। সে সাজা এড়াতে জরিমানা গুনতে হবে ১০ হাজার রিঙ্গিত (মালয়েশীয় মুদ্রা) বা বাংলাদেশি দুই লাখ টাকা।

প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে মালয়েশিয়া সরকার ব্যাক ফর গুড (চিরতরে ফেরা) কর্মসূচির আওতায় চার মাসের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। এ সময়ের মধ্যে অবৈধ শ্রমিকসহ প্রবাসীদের দেশে ফিরতে হবে।

কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকায় ফেরার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা, মালিন্দ এয়ার এশিয়া ও মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের কোনো শ্রেণিরই টিকিট স্বাভাবিক দামে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি একমুখী যাত্রায় যেখানে বিমানের ভাড়া ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ রিঙ্গিত (১০ থেকে ১২ হাজার টাকা), সেখানে এখন গুনতে হচ্ছে এক হাজার ৭০০ রিঙ্গিত। বেসরকারি এয়ারলাইনগুলো দুই হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার রিঙ্গিতে টিকিট বিক্রি করছে।

গত ২১ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার কুলালামপুরে থাকা নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার নীলক্ষ্যা ইউনিয়নের মজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে পদে পদে ঠকেছেন তিনি। মজিবুর জানান, ২০১৬ সালে মালয়েশিয়ায় কয়েক দফা টাকা দিয়েও বৈধ হতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত তিনি দেশে ফেরত আসার টিকিট কেটেছেন। তাঁর খরচ করতে হয়েছে দুই হাজার ১৫০ রিঙ্গিত।

শাহ আলম হাওলাদার নামের একজন বেশি দামে টিকিট কেটে দেশে ফিরেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেকেই টিকিট না পেয়ে আসতে পারছেন না। কিন্তু ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার সময় দেখি বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজে শতাধিক সিট খালি।’ তাঁর প্রশ্ন, টিকিটের জন্য যখন হাহাকার চলছে, বিমান কেন খালি আসন নিয়ে দেশে ফিরছে?

যাঁরা টিকিটের জন্য দেশে ফেরত আসতে পারছেন না, তাঁদের একজন কুয়ালালামপুর বুকিত বিনতাং এলাকায় থাকা রিয়াজ হোসেন। টিকিটের মূল্য বেশি হওয়ায় সেখানে অবৈধ এ শ্রমিক দেশে ফেরত আসতে পারছেন না। রিয়াজ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘দেশে ফিরতে একমুখী যাত্রায় টিকিটের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ রিঙ্গিত। কিন্তু এখন দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় টিকিট বিক্রি হচ্ছে।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমদ মনিরুছ সালেহীন বলেন, ‘ব্যাক ফর গুড কর্মসূচির আওতায় যেসব অবৈধ শ্রমিক স্বেচ্ছায় দেশে ফেরত আসছেন, ওই সব শ্রমিকের বিমান বাড়ায় ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্রমিকরা যাতে কোনো হয়রানি ছাড়া দেশে ফেরত আসতে পারেন সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে হাইকমিশনের লেবার উইংকে।’

উল্লেখ্য, গত জুলাই থেকে অবৈধদের ধরতে অভিযান শুরু করে মালয়েশিয়ার অভিবাসন পুলিশ। প্রতি মাসেই শত শত বাংলাদেশি পুলিশের হাতে আটক হয়ে কারাগারে যেতে থাকেন। অনেকেই হাইকমিশনের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফেরত আসেন। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর অবৈধ প্রবাসীদের দেশে ফেরার হার বাড়তে থাকে।

প্রবাসীরা বলছেন, মালয়েশিয়া সরকার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে অবৈধ প্রবাসীরা দেশত্যাগ না করলে পরবর্তী সময় সে দেশের সরকার কঠোর অভিযান পরিচালনা করবে। প্রতিটি শহর এবং গ্রামের অলিগলি, মার্কেট, কারখানা কোথাও বাদ রাখবে না। গ্রেপ্তার হলেই চলবে ভয়ংকর নির্যাতন। মালয়েশিয়ার পুলিশের নির্যাতনের আতঙ্কে অনেকেই দেশে ফিরে যেতে চাচ্ছেন। কিন্তু বেশি দামে টিকিট এবং জরিমানাসহ লক্ষাধিক টাকা জোগাড় করতে না পেরে অনেকেই দেশে ফিরতে পারছেন না। কেউ কেউ বেশি দামে টিকিট কাটলেও দালালদের প্রতারণার কারণে ভুয়া টিকিট ধরিয়ে দেওয়ায় দেশে ফিরতে না পারার ঘটনাও ঘটছে।

কেউ কেউ বলছেন, মালয়েশিয়া সরকার ‘ব্যাক ফর গুড’ কর্মসূচির মেয়াদ আরো দুই মাস বাড়ালে কম মূল্যের টিকিটে হয়তো তাঁরা দেশে ফিরতে পারতেন। কিন্তু সে দেশের ইমিগ্রেশন বিভাগ মেয়াদ না বাড়ানোর বিষয়ে অনড়।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.