কক্সবাজারে গোপনে ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া দেয়া হয় হোটেলের রুম!

কক্সবাজার হোটেলে সম্প্রতি পর্যটক ধর্ষণের ভূমিকায় হোটেল কর্তৃপক্ষ যদি সাধু সাজার চেষ্টা করে, তাহলে তা হবে সত্যের অপলাপ মাত্র।

হোটেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে অনেকটাই অবগত। আমি একটি হোটেলের আবাসিক ম্যানেজার এবং পরে নিয়মের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে চাকরি বদল করে একই হোটেলের রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার হিসাবে চাকরি করেছি। তাই কক্সবাজারের বিষয়টি আমি ব্যাখ্যা করছি।

এখন হচ্ছে পর্যটক আগমনের সময়। সম্প্রতি কক্সবাজারে অগণিত পর্যটক আগমনের কারণে হোটেলগুলোতে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। পর্যটকরা ঠাঁই না পেয়ে রাস্তায় রাতযাপন করেছেন। যেখানে অফ সিজনে ডাল-ভাত ত্রিশ টাকা থাকে; এ অবস্থায় তা দাঁড়ায় তিনশ টাকা, প্রায় দশগুণ বেশি দাম। আর এক হাজার টাকার রুমভাড়া কমপক্ষে সাত থেকে আট হাজার হয়ে যায়। সাধারণত স্থানীয় বখাটেরা এত টাকা নিয়ে রুমভাড়া করে না। তারা যখন এসব অনৈতিক কাজের জন্য যায়, তখন পরিচিত হোটেলেই যায়। আর পরিচিত হোটেলে ঠাঁই না পেলে, অন্য হোটেলগুলোতে স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে, ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে কাজ হাসিল করে।

আপনি যদি মনে করেন, তারা উপরের একটি পদ্ধতিও অবলম্বন না করে রুমভাড়া করেছে, তাহলে আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, পর্যটনের ভরা মৌসুমে কেউ যখন একটা হোটেলের লবিতে প্রবেশ করবে, হোটেলের ম্যানেজার ঠিকই বুঝতে পারে, লোকটা কি স্থানীয়, নাকি পর্যটক? তারা যদি বুঝতে পারে অথবা আইডি দেখার পর যদি জানতে পারে লোকটা স্থানীয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ‘রুম খালি নেই’ বলে দেয়।

কারণ একজন পর্যটক একদিনের জন্য হোটেল ভাড়া হিসাবে স্থানীয় লোকের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি টাকা দেয়। এখন কোন পন্থা অবলম্বন করলে হোটেল কর্তৃপক্ষের বিষয়টা বোধগম্য হবে যে, সেখানে অনৈতিক কোনো কাজ হতে যাচ্ছে।

যারা অনৈতিক কাজ করছে, তারা কেউ দুধের শিশু নয়। তবে তারা বুঝেও না বোঝার ভান ধরে বসে আছে। প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে কোন পদ্ধতিতে স্থানীয় বখাটেরা রুমভাড়া নিচ্ছে? সাধারণত রুমভাড়া নেওয়া কিছু পর্যটক অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের আগে রুম ত্যাগ করেন অথবা কিছু রুম খালি থাকে; কারণ ওই রুমের পর্যটকরা রাতে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেয়। হোটেল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি এড়িয়ে এসব রুম হোটেল ম্যানেজার বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকেরা ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া দিয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়। ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া দেওয়া এসব রুমের কোনো নির্ধারিত রেজিস্টার থাকে না; এগুলো একটা আলাদা খাতায় লেখা থাকে। পরে সব চোর একসঙ্গে ভাগ করে খায়।

পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত আর কক্সবাজার পর্যটন খাতের প্রাণ। তবে এখানে অনেক বেশি অনিয়ম বিরাজ করছে, যেগুলো দেখার কেউ নেই। যাদের দেখার কথা, তারা চোখে কাঠের চশমা লাগিয়ে টেবিলের নিচ থেকে কাগজ চালাচালি করে। এত হয়রানি ও অনিয়ম হওয়ার পরও প্রতি বছর অনেক লোকসমাগম হয়। এখন যদি কক্সবাজারের গলিতে, রাস্তায় বেড়ে ওঠা কিছু কুলাঙ্গারের জন্য কক্সবাজারের পুরো জেলার লোকদের বদনামের ভাগিদার হতে হয়, তাহলে এই দায়ভার কার? ওই তিন ধর্ষকের, নাকি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের, নাকি প্রশাসনের?

আমি কক্সবাজার জেলার একজন সাধারণ নাগরিক। আমি চাই এই ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। যারা তাদের অপরাধকে সমর্থন করবে, তাদের নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য উপরের চাপ সৃষ্টি করবে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। সবার সহযোগিতা আর আন্তরিকতায় কক্সবাজারের পর্যটন খাত নিরাপদ ও সুন্দর হয়ে উঠুক।

মানবাধিকার কর্মী, ব্র্যাক

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.