নোয়াখালীর নব্য ইংরেজ!

623c532dc13154ec344cdb9376ae97b6-pic-1আলমগীর নোয়াখালীর এক অজপাড়া-গাঁয়ের সহজ সরল ছেলে। গ্রাম ছেড়ে শহরে কখনো যায়নি। অল্প বয়স। লেখাপড়া খুব বেশি করেনি। হয়তো দুই-চার ক্লাস পড়েছে। সৌদিতে এসেছে মাত্র কিছুদিন হলো। পরিবেশ পরিস্থিতি সবকিছুই তার কাছে নতুন। ভাষাগত অভিজ্ঞতা তো একদমই নেই। এলাকার আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা তার জানা নেই। আঞ্চলিকতার কারণে সে তার নিজের নামটাও ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। নাম জানতে চাইলে বলে আলংগীর।

আজকাল হিন্দি-উর্দু ভাষা অনেকেই জানে। আধুনিক যুগের উন্নত প্রযুক্তি তথা ডিসের বদৌলতে এখন প্রায় ঘরে ঘরেই হিন্দি-উর্দু–ইংরেজি সিরিয়াল চলে এবং তা দেখে দেখে অনেকেই সেই ভাষা রপ্ত করতে ফেলে। নিজের দক্ষতা ও স্মার্টনেস দেখানোর জন্য কেউ কেউ মজার ছলে হোক, কিংবা ইচ্ছে করেই হোক, কথা ফাঁকে দুই-একটা ইংরেজি–হিন্দি-উর্দু শব্দ জুড়ে দিতেও কার্পণ্য করে না। আলমগীর তাও পারে না। কারণ তার গ্রামে ডিসের লাইন নেই। সে বিদেশি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখেনি কখনো। যদি কিছুটা জানা থাকত তবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে নিশ্চয়ই কাজে লাগত।
তারপরেও যদি কিছুটা শিক্ষা-দীক্ষা বা বুদ্ধিশুদ্ধি থাকত তবে সেই ধারে মোটামুটি চালিয়ে নিতে অসুবিধা হতো না। সিনেমা হলকে সিনেমা ফল কিংবা প্রবলেমকে পবলেম অথবা হালুয়াকে সালুয়া বললেও বুঝে নেওয়া যেত।
সৌদিতে সাধারণত পাড়াগাঁয়ের অতি সাধারণ ঘরের লোকজনই বেশি আসেন। পদবিও তেমন উন্নত না। বেশির ভাগই শ্রমিক পদে। এখানে আসার পর কর্মদক্ষতার গুণে অনেকে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। এমন অনেক লোকজন রয়েছেন যারা শিক্ষা-দীক্ষা কম হলেও ব্যবসা-বাণিজ্য করে বা নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রবাস ও দেশে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে নিয়েছেন। আলমগীরও হয়তো এক সময় সেই রকম পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে। অনেকে আছে শিক্ষা-দীক্ষা কম হলেও বেশ বুদ্ধিদীপ্ত। সেই বুদ্ধির গুণে আলমগীরও একদিন নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নেবে। এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা নিজের নাম লিখতে গিয়ে দাঁতের নিচে জিব কাটেন, কলমের খোঁচায় কাগজ ছিঁড়ে কিংবা কাগজ উল্টোভাবে ধরে। সেই সব লোকও দেখে দেখে ও শুনে শুনে দিব্যি ভাঙা ভাঙা হিন্দি-বাংলা-উর্দু মিলিয়ে কাজ চালিয়ে যায় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই আরবি রপ্ত করে ফেলে। কেউ কেউ চেষ্টা ও কৌশল খাঁটিয়ে ইংরেজিও শিখে নেয়। কথা বলার জন্য ভালো ইংরেজির দরকার পড়ে না। বাংলা শব্দ বরাবর ইংরেজি শব্দ বসিয়ে দিয়ে বোঝাতে পারলেই হলো। তা ছাড়া দুই-চারটা টুকটাক ইংরেজি শব্দ তো সবাই জানে। বিশেষ করে-ইয়েস, নো, গুড, ব্যাড, আন্ডারস্ট্যান্ড, আই, ইউ, ফাদার, মাদার, ব্রাদার, হাজব্যান্ড, ওয়াইফ, ম্যাডাম, স্যার ইত্যাদি।
আলমগীর আপাতত ভাষাগত দিক দিয়ে বেশ দুর্বল।
স্বভাবের ক্ষেত্রে বাঙালি একটু হিংসুটে হয়, তা প্রায় সবাই জানে। ভিনদেশি মানুষের সঙ্গে না পারলেও স্বদেশি মানুষের পিছে লাগতে বেশ ওস্তাদ। সুযোগ বুঝে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করে নেয়। আলমগীরকেও সেই রকম সহজ সরল পেয়ে অনেকেই কাজে লাগিয়েছে। প্রথম প্রথম ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের কাজ তাকে দিয়ে চালিয়ে নিয়েছে। নতুন হিসেবে তার ভুল-ভ্রান্তিও কিছু হয়েছে এবং এ জন্য তার ঘাড়ে দোষও চেপেছে। কিন্তু ভাষাগত কারণে সে জায়গা মতো নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেনি।
fd17256198e6de1bd3054f4ed0380e9d-pic-1-1কিছুদিন যাওয়ার পর, আলমগীর একটু একটু বুঝতে শিখে।
কুট বুদ্ধিসম্পন্ন সহকর্মীরা এবার তাকে ফাঁসিয়েছে অন্য একটি ঘটনায়। কর্মস্থলের কাছে মসজিদের পাশে একটা ফ্রিজ রয়েছে। সেখানে গরমের সময় কর্মবিরতিতে পান করার জন্য পানি রাখা হয়। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোমল পানীয় রাখে। সবাই ফ্রিজ ব্যবহার করা সত্ত্বেও সাধারণত কারও জিনিস কেউ ধরে না। কিন্তু তার মাঝেই ঘটে গেল একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। কেউ একজন অ্যালকোহলবিহীন বাদামি-বোতলজাত বিয়ার ফ্রিজে রেখেছিল। অন্য কেউ সেটা সুযোগ বুঝে খালি করে দিয়েছে। পর পর দুই-তিন দিন ঘটে গেল একই ঘটনা। ভরা বোতলের জায়গায় পাওয়া গেল খালি বোতল। কে এই কাজটি করল, কে সেই ভদ্র চোর? জানার জন্য দুই-তিন সহকর্মী-বন্ধু মিলে পরামর্শক্রমে চুপিসারে আড়াল থেকে একদিন নজর রাখল এবং প্রকৃত চোরের আসল চেহারা দেখতে পেল।
লেখকএর কয়েক দিন পর ইয়েমেনি একজন সুপারভাইজার, ছুটিছাটা ছাড়াই হঠাৎ কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত। শোনা গেল তিনি অসুস্থ, হসপিটালে আছেন। শুনতে শুনতে পরে আরও জানা গেল যে, তার অবস্থা মোটামুটি সংকটাপন্ন, পাকস্থলী সাফাই হয়ে চলছে অনবরত।
শুনে কেউ কেউ অগোচরে খুশি হলো।
ঘটনা তেমন কিছুই ঘটেনি, খুবই সাধারণ। বিয়ার খোয়ানো ব্যক্তি বুদ্ধি করে নতুন একটা বিয়ার খেয়ে খালি বোতলে শ্যাম্পু মেশানো পানিসহ অন্য কিছু ভরে ওই ফ্রিজে আগের মতোই রেখে দিয়েছিল। কথিত সেই বিয়ার খেকোই এখন হসপিটালে।
ঘটনা ফাঁস হওয়ার পরে দুষ্টু সহকর্মীরা বরাবরের মতো আলমগীরের ওপর দোষ চাপিয়ে দিল।
আলমগীর কাজ করত কোরিয়ান কোম্পানিতে। উচ্চপদের কর্মকর্তা সব কোরিয়ান। কিছুসংখ্যক প্রকৌশলী ছাড়া নিম্নপদে প্রায় সবই দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিক। কোরিয়ানরা শিক্ষিত হলেও তারাও যে খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারে, তা নয়। তাদের ইংরেজিও বাঙালি শ্রমজীবীদের মতোই বিক্ষিপ্ত ও চূর্ণবিচূর্ণ। আমি–র জায়গায় আই আর নার জায়গায় নো বসিয়ে আই নো অর্থাৎ আমি না অথবা আই নো ডু (আমি করি নাই) কিংবা আই স্পিক নাউ টুডে (আমি আজ এখুনি বলছি) জাতীয় বাক্য ব্যবহার করে কোনো রকম চালিয়ে যায়।
ঘটনা শুনে কোরিয়ান কর্মকর্তা তো রেগে আগুন। হাজার হাজার রিয়াল বেতন দিয়ে সেফটি-অফিসার রাখা সত্ত্বেও তার লোকজন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কর্তৃপক্ষ জানতে পারলে বড় রকমের সমস্যা হবে। ভদ্রলোক তা ভালো করেই জানেন।
অদৃশ্য অভিযোগের ভিত্তিতে ডাকা হলো আলমগীরকে। সে তো কিছুই জানে না। ভয়ে তার বুকটা কেঁপে ওঠে। কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই। ভেবেছে হয়তো কোনো কাজে ভুল হয়েছে কিংবা তার মাধ্যমে এমন কোনো ক্ষতি হয়েছে যা ক্ষমার অযোগ্য। আজ হয়তো আর ছাড়াছাড়ি নেই। আল্লাই জানেন। কোরিয়ান ভদ্রলোককে দেখে তো আলমগীর প্রায় মূর্ছাগত অবস্থা। বাজখাই গলায় ভদ্রলোক চোখ রাঙিয়ে গর্জে উঠলেন, হোয়াই? হোয়াই?
আলমগীর তত দিনে একটু একটু বুঝতে শিখেছে। টের পেরেছে যে, তার মাথায় কাঁঠাল রেখে অনেকেই খেয়ে যাচ্ছে এবং কাজে ফাঁকি দিয়েও ক্রেডিট নিচ্ছে। আবার এটাও তার বোধগম্য হয়েছে, অন্যের বুদ্ধিতে জমিদার হওয়ার চেয়ে নিজের বুদ্ধিতে বর্গাদার-চাষি হওয়া অনেক উত্তম। তাতে অন্তত সান্ত্বনা পাওয়া যায়। সেই খেয়ালেই বাংলার সঙ্গে দুই-একটা ইংরেজি লাগিয়ে অন্যের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে গেল। আর সেই চেষ্টাই পরে কাজে লাগল।
দোষ না করেও আলমগীর এখন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। কী করবে সে? কী জবাব দেবে? দিশামিশা না পেয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাতজোড় করে বলল, স্যার, স্যার গো, আঁই ন আন্ডারস্ট্যান্ড।
কোরিয়ান লোকটি বুঝলেন, আই নো আন্ডারস্ট্যান্ড। ধমক দিয়ে আবার বললেন, ইউ নো আন্ডারস্ট্যান্ড?
আলমগীর না বুঝেই বলল, ইয়েস স্যার।
আঁই ন আন্ডারস্ট্যান্ড আলমগীরের আঞ্চলিক ভাষা। যার অর্থ হলো আঁই ন জানিয়ের। ভদ্রলোক কী ভেবেছেন কে জানে। আলমগীরকে ক্ষমা করে দিলেন।
এই নিয়ে সে কী হাসাহাসি! কেউ কেউ রসিকতা করে বলল, নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা থেকেই নাকি ইংরেজির উৎপত্তি হয়েছে। আর আলমগীর হচ্ছে সেই নোয়াখালীর নব্য ইংরেজ।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.