অভিজ্ঞ ক্রু শাহনাজ বেগমকে সরিয়ে প্রশ্নের মুখে বিমান ম্যানেজমেন্ট

বিমান প্রশাসনে এখনো আওয়ামী ভূত!

সিএএবি ফাইন্ডিং নিষ্পত্তির উদ্যোগে শাহনাজ বেগমকে দায়িত্ব, পরে বাতিল; প্রশ্নের মুখে বিমানের সিদ্ধান্ত

বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের শূন্য উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদ পূরণকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের (CAAB) উত্থাপিত ফাইন্ডিং নিষ্পত্তি এবং কেবিন অপারেশনের সাংগঠনিক কাঠামো পূর্ণাঙ্গ করার লক্ষ্যে অভিজ্ঞ কেবিন ক্রু কর্মকর্তা শাহনাজ বেগমকে ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে তড়িঘড়ি করে সেই পদায়ন বাতিল করা হয়, যা নিয়ে বিমান অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের তৈরি করা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে সরে যেতে হয়েছে শাহনাজ বেগমকে।

জানা গেছে দায়িত্ব পালনকালে শাহনাজ বেগমের কঠোর অবস্থানের কারনে ফ্লাইট সার্ভিসে চোরা চালান, গোল্ড স্মাগলিং, মানি লন্ডারিং এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। এই সাথে অবৈধ কাপল ফ্লাইট এখন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, শিডিউলিং টেমপারিং করে আওয়ামী আমলের ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিলেন এই শাহনাজ।

অভিযোগ উঠেছে এই আওয়ামী সিন্ডিকেটই কৌশলে বিমান ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যোগ সাজসে তার পদায়ন বাতিল করে। এই ঘটনায় মোটা অংকের আন্ডার ডিলিংয়েরও অভিযোগ করেছেন অনেকে।

বিমানের কেবিন অপারেশন অ্যান্ড সেফটি ম্যানুয়াল অনুযায়ী, ডিজিএম ফ্লাইট সার্ভিস কেবিন অপারেশনের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এই পদের অধীনে কেবিন সেফটি ও সিকিউরিটি ব্যবস্থাপনা, অপারেশন তদারকি, কেবিন ক্রু প্রশিক্ষণ, শিডিউলিং, ব্রিফিং, ইন-ফ্লাইট সার্ভিস এবং CAAB-এর বিধি-বিধান বাস্তবায়নের দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে। ম্যানুয়ালে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, ডিজিএম ফ্লাইট সার্ভিসের অধীনে ম্যানেজার ফ্লাইট সার্ভিস, ম্যানেজার প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং এবং একাধিক চিফ পার্সার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন।

সিএএবির অডিট পর্যবেক্ষণে ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের ডিজিএম পদটি দীর্ঘদিন শূন্য থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ফাইন্ডিংয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদটি পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়। সূত্রগুলোর দাবি, সেই ফাইন্ডিং নিষ্পত্তির অংশ হিসেবেই শাহনাজ বেগমকে ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, শাহনাজ বেগম প্রায় ৩৭ বছরের কেবিন সেফটি ও সার্ভিস অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন কর্মকর্তা। তিনি চিফ পার্সার ব্রিফিং, ম্যানেজার (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং) এবং ব্যবস্থাপক (ফ্লাইট সার্ভিস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেবিন অপারেশন ম্যানুয়ালে ডিজিএম পদে দায়িত্ব পালনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কেবিন ক্রু অভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের অভিজ্ঞতার যে শর্ত রয়েছে, তার সঙ্গে শাহনাজ বেগমের অভিজ্ঞতা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তার সমর্থকরা দাবি করেন।

এদিকে তার পদায়ন বাতিলের পেছনে সাবেক আওয়ামী আমলের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর তদবির কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন কর্মচারীর দাবি, কেবিন ক্রু ইউনিয়নের কিছু নেতা বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এনে পদায়ন বাতিলের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাধারণ কর্মীদের  দাবি, শাহনাজ বেগমের  কঠোর প্রশাসনিক অবস্থানের কারণে ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগে বিভিন্ন অনিয়ম, শিডিউলিং টেম্পারিং এবং প্রভাব খাটিয়ে ডিউটি বণ্টনের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণেই একটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়।

এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি মামলাকেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের বক্তব্য, মামলায় উল্লেখিত ঘটনার সময় তিনি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের দায়িত্বে দেশের বাইরে ছিলেন। বিমান পরিচালনা সংক্রান্ত ফ্লাইট লগ, ডিউটি রোস্টার, ফ্লাইট সার্টিফিকেট এবং অন্যান্য রেকর্ডে তার বিদেশে অবস্থানের তথ্য রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি আইনগত প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়েছেন বলেও জানা গেছে।

অন্যদিকে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত বিতর্ক ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা থাকলেও এ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিএম পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে CAAB-এর ফাইন্ডিং নিষ্পত্তি বিলম্বিত হতে পারে। পাশাপাশি কেবিন অপারেশনের প্রশাসনিক ও তদারকি কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা মনে করেন, বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনা করে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

বিমান কর্মীদের একাংশের প্রত্যাশা, উদ্ভূত বিতর্কের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা হবে এবং ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের শূন্য ডিজিএম পদ দ্রুত পূরণ করে CAAB-এর ফাইন্ডিং নিষ্পত্তির উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হবে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.