বিমানকর্মী ছাঁটাইয়ের ‘সুনামি’

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বৈশ্বিক বিমান পরিবহন খাত। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে লকডাউনসহ নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে এয়ারলাইনসগুলোর কার্যক্রম এখন একেবারেই স্থবির। শিগগিরই এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। ফলে টিকে থাকতে ও ব্যয় কমাতে এরই মধ্যে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে অধিকাংশ ইউরোপীয় এয়ারলাইনস। একই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোও। সিএনএন বিজনেস।

গত সপ্তাহজুড়েই ইউরোপের শীর্ষ এয়ারলাইনসগুলো তাদের হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের সম্ভাবনার কথা জানায়। কারণ বর্তমানে যেমন তারা ক্ষতির মুখে রয়েছে, তেমনি নিকট ভবিষ্যতেও ব্যবসা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার তারা কোনো আশা দেখছে না। ফলে রায়ানএয়ার, লুফথানসা, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস ও এয়ার ফ্রান্স-কেএলএমের মতো বিমান পরিবহন সংস্থা সব মিলিয়ে অন্তত তাদের ৩২ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করতে পারে।

জার্মানির বিমান পরিবহন সংস্থা লুফথানসার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কার্স্টেন স্ফোর বলেন, বর্তমানে আমরা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সত্যি বলতে, আমরা সংস্থাটির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যুদ্ধ করছি। একইভাবে যুদ্ধ করছি লুফথানসার ১ লাখ ৩০ হাজার কর্মীর ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্যও। গত শুক্রবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে স্ফোরের এ বক্তব্য তুলে ধরা হয়।

লুফথানসা গ্রুপ এরই মধ্যে তাদের ৮০ হাজারের বেশি কর্মীর কর্মঘণ্টা হ্রাস করেছে। একই সঙ্গে সংস্থাটির ফ্লাইট শিডিউলের পতন হয়েছে অভাবনীয়। ১৯৫৫ সালের পর এমন পরিস্থিতি আর কখনো দেখা যায়নি। বর্তমানে তাদের বাতিলকৃত ফ্লাইটের সংখ্যা দৈনিক তিন হাজার। তাছাড়া সংস্থাটির উড়োজাহাজ বহরের ৯২ শতাংশই গ্রাউন্ডেড অবস্থায় রয়েছে। স্ফোর বলেন, এ পরিস্থিতি ভয়াবহ তিক্ত ও পীড়াদায়ক।

বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ রয়েছে। কখন যাত্রী চাহিদা ফিরে আসবে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট করে এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। ফলে বৈশ্বিক বিমান পরিবহন সংস্থা যে মারাত্মক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। ব্রিটিশ এয়ারলাইনস পাইলটসের সাধারণ সম্পাদক ব্রায়ান স্ট্রাটন বলেন, এভিয়েশন শ্রমিকরা এখন ছাঁটাইয়ের সুনামির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় সরকারি সহায়তা ছাড়া পুরো খাতই ধ্বংস হয়ে যাবে। এরই মধ্যে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ তাদের কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে। গত মঙ্গলবার সংস্থাটির পক্ষ থেকে এক-চতুর্থাংশের বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়।

অন্যদিকে শুক্রবার কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা জানিয়েছে রায়ান এয়ার। যাত্রী পরিবহনের দিক দিয়ে ইউরোপের সবচেয়ে বৃহৎ এ এয়ারলাইনস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের পুনর্গঠিত কার্যক্রম শুরু হবে আগামী জুলাই থেকে। পুনর্গঠন পরিকল্পনার আওতায় সংস্থাটির পাইলট, কেবিন ক্রুসহ চাকরি হারাতে পারেন তিন হাজার কর্মী, যা সংস্থাটির মোট কর্মী সংখ্যার ১৫ শতাংশ। এছাড়া বেতন কর্তন ও ইউরোপজুড়ে ফ্লাইট কমিয়ে আনারও পরিকল্পনা করছে রায়ানএয়ার।

এদিকে ইউরোপীয় এয়ারলাইনসের মতো মার্কিন বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোও বর্তমানে কোটি কোটি ডলার লোকসানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের হিসাব থেকে এ তথ্য এখন স্পষ্ট। এ অবস্থায় আকারে ও কার্যক্রমে সংকুচিত হতে থাকা আমেরিকান এয়ারলাইনসগুলোও কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটতে বাধ্য হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে শীর্ষ চার মার্কিন বিমান পরিবহন সংস্থা আমেরিকান (এএএল), ইউনাইটেড (ইউএএল), ডেল্টা (ডিএএল) ও সাউথওয়েস্ট (এলইউভি) তাদের কর্মীদের মজুরি কর্তনের বিষয়ে একমত হয়েছে। অনেক কর্মীকে তারা নয় মাস পর্যন্ত বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানোর কথাও ভাবছে।

ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বৈশ্বিকভাবে এয়ারলাইনের যাত্রী আয়ে চলতি বছর পতন হবে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত, যার আর্থিক পরিমাণ ৩১ হাজার ৪০ ডলারের কাছাকাছি। এ পরিস্থিতিতে সহায়তার জন্য সরকারের দ্বারস্থ হয়েছে অধিকাংশ শীর্ষ ইউরোপীয় ও আমেরিকান বিমান পরিবহন সংস্থা। টিকে থাকতে ব্যয়সংকোচন ও সহায়তার বিকল্প তারা খুঁজে পাচ্ছে না।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.