বাংলাদেশের সব ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজ নিজ ধর্মীয় সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে কাজ করে যাচ্ছে সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারা দেশে মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডার উন্নয়ন করা হচ্ছে। শিগগিরই সরকারিভাবে প্রতি জেলা ও উপজেলায় নির্মাণ করা হবে একটি করে মসজিদ কমপ্লেক্স। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ হজ ব্যবস্থাপনা। সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনা চালু করার ফলে গত ২ বছর হজ ব্যবস্থাপনায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এবারও হজ ব্যবস্থাপনাকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
সম্প্রতি একটা পত্রিকাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এসব কথা বলেন। পাঠকদের জন্য পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
আপনার মেয়াদে এ মন্ত্রণালয়ের উল্লেখযোগ্য সাফল্য বা অর্জন সম্পর্কে জানতে চাই।
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান : আমার সময়ে এ মন্ত্রণালয়ের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হচ্ছে সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনা। আমার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম থেকেই বিশেষ উদ্যোগের কারণে হজ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুষ্ঠু, সুন্দর ও সাবলীল হয়েছে। এটা সবাই জানেন। এ কারণেই গত ২ বছর সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রথম স্থান অর্জনের স্বীকৃতি দিয়েছে সৌদি আরব। আগামীতেও এ অর্জনের ধারাবাহিকতা থাকবে বলে আশা করি।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বর্তমানে উন্নয়নমূলক কী ধরনের কাজ চলছে?
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান : আমার মন্ত্রণালয়ের সব কাজেই গতি লক্ষ করছি। হজ ও আনুষঙ্গিক সব কাজ ঠিকমতো হচ্ছে। এ বছর থেকে হজ ব্যবস্থাপনায় ই-হজ সিস্টেম চালু করা হয়েছে। হজ কার্যক্রম ছাড়াও এ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারা দেশে মসজিদ, মাদরাসা, গির্জা, প্যাগোডার উন্নয়ন করে যাচ্ছি।
ধর্ম মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের সব ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজ নিজ ধর্মীয় সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ধর্মীয় সম্প্রীতি জোরদার করার মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে সামাজিক বন্ধন রচিত হয়েছে। শান্তি, উন্নয়ন, মানবাধিকার, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় অন্তর্ভুক্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা-চেতনা কী ছিল বলে মনে করেন? মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত হিসেবে খ্যাত টঙ্গীর তুরাগ তীরের বিশ্ব ইজতেমা আয়োজন ও জায়গা বরাদ্দের ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর বিশেষ ভূমিকা ছিল বলে শোনা যায়, এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান : দেশে ইসলামের প্রচার কাজ পরিচালনার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া ইসলামের দাওয়াতি কাজের জন্য তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার জায়গা বরাদ্দ দিয়েছিলেন তিনি। এসব ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল শতভাগ। তিনি সব সময় এসব দিকে লক্ষ্য রাখতেন। এসব প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে বঙ্গবন্ধু আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি সফলকামও হয়েছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামী দিনেও এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
দেশে ইসলামের নামে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আপনার মন্ত্রণালয় থেকে কী ভূমিকা নেয়া হচ্ছে?
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান : সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিষয়ে আমাদের সরকারের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।
সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমরা সবাইকে সজাগ রাখছি, নির্দেশনা দিচ্ছি। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ ও জেলায় জেলায় সচেতনতামূলক সমাবেশ করা হচ্ছে।
এদেশের মানুষ সহজ-সরল-ধর্মপ্রাণ। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে একটি গোষ্ঠী ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে ইসলামের নাম ব্যবহার করে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করছে। কিছু তরুণকে দিয়ে সাধারণ-নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। এর মধ্য দিয়ে তারা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আমাদের সরকারের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়। কিন্তু তাদের এ পরিকল্পনা আমরা বাস্তবায়ন হতে দেব না। সব স্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা অতীতের মতো এ সমস্যার সমাধান করব ইনশাআল্লাহ।
দেশের মসজিদগুলোর ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সরকারিভাবে বেতন-ভাতা দেয়ার কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান : দেশের মসজিদগুলোর ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সরকারিভাবে বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য আমাদের পরিকল্পনা আছে। তবে এ বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। পর্যায়ক্রমে সব মসজিদে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আংশিক বেতন দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
প্রতি জেলা-উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে মসজিদ নির্মাণের কোনো কার্যক্রম শুরু হয়েছে কিনা?
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান : সব জেলা ও উপজেলায় একটি করে সরকারি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। এখন মসজিদের ডিজাইন তৈরিসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চলছে। আশা করি, শিগগিরই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সব মসজিদের সঙ্গে কমপ্লেক্স তৈরি করা হবে। সেখানে মুসল্লিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। তাবলিগের কাজে আসা মুসল্লিদের এন্টারটেইনমেন্টেরও ব্যবস্থা করা হবে।
এবারের হজ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে কী ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে?
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান : হজ ব্যবস্থাপনা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৭ বছরে অত্যন্ত সুন্দরভাবে হজ ব্যবস্থাপনা সম্পাদন করেছে। এবারের হজ ব্যবস্থাপনাকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে এরই মধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। সৌদি আরবে বাংলাদেশী হজযাত্রীদের সেবা প্রদানের জন্য আমাদের জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় হজ অফিস চলাকালীন ২৪ ঘণ্টা তারা দায়িত্ব পালন করবে। এরই মধ্যে আমরা তিনজন মৌসুমি সহকারী হজ অফিসার, হজ প্রশাসনিক দল, হজ চিকিৎসক দল এবং আইটি দল চূড়ান্ত করেছি। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে সৌদি আরবে চলে গেছে, অবশিষ্টরা দুই-একদিনের মধ্যেই সৌদি আরবে পৌঁছে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এ বছরের হজ ব্যবস্থাপনাকে আমরা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ।
সৌদি আরব থেকে বরাদ্দ দেয়া কোটার চেয়ে দেশে হজযাত্রীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে, এ অবস্থায় কোটা বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন কিনা?
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান : কোটা বাড়ানোর জন্য সৌদি সরকারের কাছে চিঠি লিখেছি। তারা আমাদের বলেছে, মক্কা-মদিনায় যে উন্নয়ন কাজ চলছে, তা শেষ হলে আমাদের কোটা বাড়ানো হবে। আশা করি, আগামীতে আমাদের কোটা বাড়বে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশবাসীর প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান : ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সবার কাছে অনুরোধ করছি যে, ইসলামের শাশ্বত বাণী মনে রেখেই তারা যেন আগামীদিনে কাজ করে যায়। সেটি হলেই ইসলাম যে শান্তির ধর্ম, তা উপলব্ধি করতে পারবে এবং সে আদর্শ অনুযায়ী সবাই কাজ করতে পারবে বলে মনে করি।
