শাহজালালের রানওয়ে পরিস্কারে “ঝাড়ু থেরাপ”

নির্বিকার বেবিচকের চেয়ারম্যান, মেম্বার (অপারেশন)

উড়োজাহাজের নিরাপদ ওঠানামার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা জরুরি বিমানবন্দরের রানওয়ে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ কাজে তেমন নজর নেই কর্তৃপক্ষের। রানওয়ে পরিষ্কারের জন্য যে তিনটি সুইপার যন্ত্র (সুইপিং গাড়ি) ছিল তার সবকটি এখন অকেজো।

এর মধ্যে দুটি নষ্ট হয়েছে প্রায় ১০ বছর আগে। জোড়াতালি দিয়ে চলছিল আরেকটি। সেটা ছিল—কখনো সচল, কখনো অচল। গত বছরের ৩০ নভেম্বর থেকে সেটিও অকেজো। তখন থেকে কার্যত ‘ঝাড়ুথেরাপি’র মাধ্যমে চলছে রানওয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। অর্থাৎ- রানওয়ে পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে সাধারণ ঝাড়ু দিয়ে। ফলে ঝঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরের রানওয়ে।

গত ৯ এপ্রিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক‍্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদের লেখা এক চিঠিতে ফুটে উঠেছে পরিচ্ছন্নতা কাজের এই চিত্রই।

সুইপার মেশিন এখন একটাও সচল নেই এটা ঠিক। তবে ম‍্যানুয়াল পদ্ধতিতে রানওয়ে পরিষ্কার রাখছি। ফ্লাইটের পাইলটরা কোনো অভিযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব‍্যবস্থা নিচ্ছি
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের কাছে লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘টি-৩ যুক্ত হওয়ায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে, টেক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকার সুইপিং কাজের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপকভাবে।

বর্তমানে শাহজালালের একটিমাত্র রানওয়েতে রয়েছে সুইপার (আরএস-৪) যন্ত্র। যার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়ে থাকে সমগ্র এয়ারক্রাফট মুভমেন্ট এলাকা। গত বছরের ৩০ নভেম্বর থেকে ওই আরএস-৪ মেশিনটি নষ্ট থাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হচ্ছে না এয়ারক্রাফট মুভমেন্ট এরিয়া। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এয়ারক্রাফটগুলোর নিরাপদ চলাচল। টি-৩ অ্যাপ্রোন পরিধি বিবেচনাপূর্বক আরও দুটি রানওয়ে সুইপার (আরএস-৪) মেশিন কেনা প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগীব সামাদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সুইপার মেশিন এখন একটাও সচল নেই এটা ঠিক। তবে ম‍্যানুয়াল পদ্ধতিতে রানওয়ে পরিষ্কার রাখছি। ফ্লাইটের পাইলটরা কোনো অভিযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব‍্যবস্থা নিচ্ছি আমরা।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছিলেন, ‘সংকট আছে বলেই দ্রুত মেশিন কেনার জন‍্য চিঠি লিখেছি।’

এর আগে ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর শাহজালালের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মাদ কামরুল ইসলাম জরুরি ভিত্তিতে দুটি অত্যাধুনিক সুইপার যন্ত্র কিনতে চিঠি দিয়েছিলেন বেবিচককে। তবে তা কার্যকর হয়নি আজও।
এই দুরবস্থার কথা জানিয়ে এর আগে বিদেশি

এয়ারলাইনসগুলো ইন্টারন্যাশনাল সিভিল অ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশনকে (আইকাও) চিঠি দিলেও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের। চলমান পরিস্থিতিকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তারা বলেছেন, একটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর এয়ারক্রাফটের দাম ১২০০-১৫০০ কোটি টাকা। শাহজালালের ঝুঁকিপূর্ণ রানওয়ের কারণে যদি কোনো এয়ারক্রাফট দুর্ঘটনায় পড়ে সেজন্য দায়ী থাকবে সিভিল অ্যাভিয়েশন।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের পর প্রত্যেকবার সুইপার যন্ত্রের মাধ্যমে রানওয়ে পরিষ্কার করাই নিয়ম। এ ছাড়া সপ্তাহে অন্তত দুবার ফ্লাইট অপারেশন বন্ধ রেখে ক্লিন করতে হয় রানওয়ে। কারণ বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের পর রানওয়েতে তৈরি হয় নুড়িপাথর। পাশাপাশি অনেক সময় বিমানের অনেক পার্টস, ফাস্টেনার (স্ক্রু) এবং প্লাস্টিক বস্তু পড়ে থাকতে পারে রানওয়েতে, যা উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সদস্য (অপারেশনস) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলছিলেন, ‘সুইপার যন্ত্রগুলো অচল হয়ে গেছে কি না, সেটা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে।’ আর তা জানতে এ প্রতিবেদককে সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

সুইপার যন্ত্রের অভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করার বিষয়টি আপনি জানেন কি না— এই প্রশ্নের জবাবে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানা নেই আমার। এটা প্রথম শুনলাম আপনার মুখেই।’

তবে বিমানবন্দরসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অকেজো হওয়া সুইপার যন্ত্রগুলোর মধ্যে রানওয়ে সুইপার ইঞ্জিন (মডেল নম্বর-০৮২৫৫) কেনা হয়েছিল ২০০৬ সালের ১৬ মার্চ। ১০ বছর চলার পর ২০১৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে এটি পুরোপুরি অচল। একই বছরের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা হয় রয়্যার বেজড রানওয়ে দ্বিতীয় সুইপার যন্ত্র (মডেল নম্বর-সিআর-৪৫০)। মাত্র আট মাস যেতে না যেতেই পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে সেটি।

জোড়াতালি ও স্পেয়ার পার্টস দিয়েও আর সচল করা সম্ভব হয়নি যন্ত্রটি। ২০১৫ সালে ইতালি থেকে কেনা হয় তৃতীয় রানওয়ে সুইপার যন্ত্রটি। অভিযোগ আছে— ক্রয়ের পর থেকেই বেশিরভাগ সময় অচল ছিল যন্ত্রটি। এটি সচল রাখতে মাঝেমধ্যে খরচ করা হতো লাখ লাখ টাকা। পরে অচল হয়ে পড়ে তিনটি যন্ত্রই। এ কারণে নতুন করে দুটি যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং কয়েক দফা টেন্ডার আহ্বান করা হলেও চূড়ান্ত হয়নি এখনো।

শাহজালালের থার্ড টার্মিনালের একটি অংশের অপারেশনাল কার্যক্রম চালুর প্রক্রিয়া চলমান। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের আয়তন হবে দ্বিগুণ। এ অবস্থায় বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিমান অ্যাভিয়েশন পাইলটরা জানিয়েছেন, রানওয়ে পরিষ্কারের কাজটি খুবই টেকনিক্যাল ও গুরুত্বপূর্ণ। একটি এয়ারক্রাফট যখন রানওয়েতে অবতরণ করে তখন তার প্রতিটি টায়ারের রানওয়েতে লেগে যায় ১.৫ পাউন্ড পর্যন্ত কালো রাবার। একটি এয়ারবাসে (এ-৩৮০) থাকে ২২টি চাকা। অবতরণের সময় ঘর্ষণে এসব চাকার রাবার কালো ও মসৃণ করে ফেলে রানওয়ের পৃষ্ঠকে।

রানওয়েতে থাকা বিভিন্ন লাইনের সাদা বা বিভিন্ন রঙের দাগগুলোকে ঢেকে ফেলে, যা একটি ফ্লাইটের নিরাপদ অবতরণের ক্ষেত্রে সৃষ্টি করে বড় ধরনের ঝুঁকি। ম্যানুয়ালি ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করা সম্ভব নয় এসব রাবার। গরম পানি ঢেলে এবং সুইপার যন্ত্র দিয়ে পরিষ্কার করতে হয় সেগুলো।

সৌজন্যে: আগামীর সময়, মাহবুব আলম লাভলু

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.