হিলারির জন্য জোরেশোরে নামলেন ওবামা

55fc967ad031dae0e0c10c062e605836-c_03যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচনে নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট ওবামা এখন পুরোপুরি প্রচারকাজে নেমে পড়েছেন। গত দুই দিন তিনি কাটালেন ওহাইওর কলম্বাস ও ক্লিভল্যান্ডে নির্বাচনী জনসভায়। দুই জায়গায় তিনি এ কথা গোপন রাখলেন না যে অন্য কেউ নয়, তাঁর পর হোয়াইট হাউসের চাবির গোছাটি তিনি হিলারির হাতেই তুলে দিতে চান।

গত শুক্রবার ক্লিভল্যান্ডে এক জনসভায় ওবামা মনে করিয়ে দিলেন, ‘ট্রাম্প প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁকে ভোট দিলে হারানোর কী আছে? আমি বলি, সবকিছুই আমরা হারাব।’ ট্রাম্পকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কহীন একজন ধনীর দুলাল হিসেবে চিত্রিত করে ওবামা বলেন, যে মানুষ সারা জীবন সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে শুধু আরও সম্পদ আহরণে সময়ব্যয় করেছেন, তিনি কী করে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবেন? সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প নিজেকে ‘এলিটবিরোধী’ হিসেবে চিত্রিত করে ওয়ালস্ট্রিটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। একে পুরো ব্যাপারটা ধাপ্পা হিসেবে উল্লেখ করে ওবামা বললেন, এই লোক যে সারা জীবন কাটালেন সবাইকে এ কথা বোঝাতে যে তিনিই সেরা এলিট, তিনিই সেরা ধনী, তিনি এখন হঠাৎ এলিটবিরোধী হয়ে গেলেন? ঠাট্টার সুরে ওবামা বললেন, ‘কাম অন, ম্যান!’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এর আগের দিন কলম্বাসে এক জনসভায় ওবামা ট্রাম্পের মতো একজন বিপজ্জনক মানুষকে তাঁদের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য রিপাবলিকান পার্টির নেতাদের কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘এই লোকটিকে আপনারাই সৃষ্টি করেছেন।’ তাঁর প্রায় আট বছরের শাসনামলে এই দল তাঁকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে একের পর এক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়েছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ওবামা বলেন, গত আট বছর যাঁরা শুধু তাঁর বিরুদ্ধতায় কাটিয়েছেন, এখন তাঁদের ট্রাম্প থেকে আলাদা থাকার চেষ্টা করলে লাভ হবে না। তিনি বলেন, ‘যাঁরা একসময় তাঁকে সমর্থন করেছেন, এখনো করে যাচ্ছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁরাও ডুববেন।’

শুধু প্রেসিডেন্ট ওবামা নন, ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হিলারির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে হাত লাগিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় তিন ব্যক্তিত্ব যেভাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন, একে জাপানি কামিকাজি ধাঁচের সাঁড়াশি আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন একজন ভাষ্যকার। অন্যদিকে ট্রাম্পের পক্ষে রিপাবলিকান দলের প্রথম সারির কোনো নেতাই মাঠে নামেননি। তাঁকে একাই সব সামলাতে হচ্ছে।

ওবামা যেভাবে হিলারির নির্বাচনকে একটি ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাতে অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। রিপাবলিকান রাজনীতিকেরা ওবামাকে হিলারির ‘ক্যাম্পেইনার ইন চিফ’ নামে ডাকা শুরু করেছেন। ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওর ডোমেনিকো মন্তানারো লিখেছেন, গত ১০০ বছরে অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট নিজের উত্তরসূরি নির্বাচনে এমনভাবে প্রচারে হাত লাগাননি।

প্রেসিডেন্ট ওবামার পূর্বসূরিদের অধিকাংশই তাঁদের মেয়াদ শেষে অত্যন্ত বিতর্কিত রাজনীতিক হয়ে ওঠেন এবং তাঁদের জনপ্রিয়তা হারান। ইরাক যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জর্জ বুশ তাঁর নিজ দলের সমর্থকদের কাছেই সমালোচিত ছিলেন। সে কারণে ২০০৮ সালে দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন ম্যাককেইন তাঁকে কার্যত এড়িয়ে চলেন। এর আগে ২০০০ সালে বিল ক্লিনটনের স্থলাভিষিক্ত হতে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ছিলেন আল গোর। প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিল ক্লিনটন যথেষ্ট জনপ্রিয় হলেও নারীঘটিত নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে তিনি বিতর্কিত হয়ে পড়েন। আল গোর তাঁকে নিজের পক্ষে প্রচারে খুব সীমিতভাবে ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি রোনাল্ড রিগ্যান, যিনি তাঁর শাসনামলের শেষ দিন পর্যন্ত অসম্ভব রকম জনপ্রিয় ছিলেন, নিজের উত্তরসূরি হিসেবে জর্জ এইচ বুশের জন্য একটিও নির্বাচনী সভায় অংশ নেননি। হোয়াইট হাউসের এক ডিনারে তিনি জর্জ বুশের মনোনয়নের সমর্থনে তিন লাইনের এক ভাষণ দেন। সেখানে বুশের নামটি পর্যন্ত সঠিকভাবে উচ্চারণ পর্যন্ত করেননি।

অন্যদিকে ওবামা এ কথা গোপন রাখেননি যে হিলারিকে সাহায্য করা তাঁর জন্য একটি ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ। গত আট বছর যাঁরা তাঁকে টেনে নামানোর জন্য অহোরাত্রি চেষ্টা করে গেছেন, তাঁরা কেউ হোয়াইট হাউসে আসুক, তা তিনি চান না। ক্লিভল্যান্ডের জনসভায় তিনি বারবার বলেন, হিলারি নির্বাচিত হোন, তা তিনি ভীষণ ভীষণভাবে চান।

এই মুহূর্তে হিলারির প্রতি মার্কিন জনগণের ৫৫ শতাংশের সমর্থন রয়েছে। হিলারিও এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে চান। কোনো কোনো প্রশ্নে ওবামার অনুসৃত নীতির বিরোধিতা করলেও তিনি খোলামেলাভাবেই নিজেকে ওবামার উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত করিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে আগ্রহী তাঁর দুটি নির্বাচনী প্রচারে যে ‘ওবামা মোর্চা’ গড়ে উঠেছিল, তা গড়ে তোলা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই কাজে তিনি সফল হননি। ‘মিলেনিয়াল’ নামে পরিচিত তরুণ ভোটাররা হিলারিকে ওয়াল স্ট্রিটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে বিশ্বাস করেন না।

হিলারি আশা করছেন, নির্বাচনী প্রচারে ওবামার ব্যক্তিগত অংশগ্রহণ তরুণ, আফ্রিকান-আমেরিকান ও হিস্পানিকদের মধ্যে তাঁর ব্যাপারে নিস্পৃহতা কাটাতে সাহায্য করবে। এই রণকৌশলের অবশ্য একটি বিপদ রয়েছে। রিপাবলিকানরা হিলারিকে ওবামার ‘তৃতীয় দফা’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। ওবামার আট বছরের পর অনেকেই—বিশেষত রিপাবলিকান ও দলনিরপেক্ষ ভোটাররা—হোয়াইট হাউসে নতুন মুখ দেখতে চান। অধিকাংশ ভাষ্যকারই একমত, ট্রাম্পের মতো একজন বিতর্কিত প্রার্থীর বদলে অন্য কোনো মধ্যপন্থী রাজনীতিককে যদি রিপাবলিকান দল মনোনয়নে সক্ষম হতো, ওবামার উত্তরসূরি হিসেবে হিলারির নির্বাচন অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়ত।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.