গাফিলতি ছিল বিমানের নিরাপত্তা বিভাগেরও

ranga-provatপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ইঞ্জিনে বি-নাট ঢিলার ঘটনায় সংস্থাটির নিরাপত্তা বিভাগেরও চরম গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। ভিডিও ফুটেজে ঘটনার আগে ভিভিআইপি ওই ফ্লাইটের আশপাশে বিমানের সিকিউরিটি বিভাগের কোনো গার্ড ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি।

আর এ কারণেই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ঘটনার দিন ওই ফ্লাইটের দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এরই ভিত্তিতে বুধবার নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান মেজর (অব.) আলী মোস্তফা মামুনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ নোটিশের খসড়াও চূড়ান্ত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, তা আগামী সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে ওই খসড়ায়। খুব শিগগির আরও কয়েক জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে বিমানের প্রশাসন বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র। জানতে চাইলে আলী মোস্তফা মামুন যুগান্তরকে বলেন, তিনি এখনও কোনো ধরনের নোটিশ পাননি। নোটিশ পেলে জবাব দেবেন বলেও জানান তিনি। তার মতে, ঘটনার দিন ওই ফ্লাইটে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তারা সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও বিষয়টি যথাযথভাবে মনিটরিং করেছেন। দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমান মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির একজন সদস্য বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কোনো উড়োজাহাজকে ভিভিআইপি ফ্লাইট হিসেবে ঘোষণা করার পর ওই ফ্লাইটের দায়িত্ব চলে যায় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) হাতে। তবে সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে বিমানের নিজস্ব সিকিউরিটি গার্ডের কাছে। সে অনুযায়ী ফ্লাইটটি উড্ডয়নের আগ পর্যন্ত হ্যাঙ্গারে থাকা উড়োজাহাজে যে কোনো ধরনের কাজ করা ও নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রবেশ করতে হলে বিমান সিকিউরিটির অনুমতি লাগে। আর আগে এই বিভাগের প্রধান হিসেবে জেনারেল ম্যানেজার মমিনুল ইসলাম যখন ছিলেন, তখন এ ধরনের ভিভিআইপি ফ্লাইটের দেখভালে অতিরিক্ত কমপক্ষে ২০ জন নিরাপত্তা কর্মীকে দায়িত্ব দেয়া হতো। ফ্লাইট উড্ডয়নের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজে এসএসএফসহ বিমানবন্দরে কর্মরত সব গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করতেন।

কিন্তু এই প্রথমবারের মতো ভিভিআইপি ফ্লাইটে বিমানের নিজস্ব অতিরিক্ত কোনো নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্বে ছিলেন না। অভিযোগ বিমানের সিকিউরিটি শাখার কতিপয় অসাধু সদস্য সাধারণত নিজেদের দায়িত্ব পালন না করে সারাক্ষণ অন্য ধান্ধায় ব্যস্ত থাকেন। তদন্ত সংস্থার রিপোর্টেও বলা হয়েছে, সিকিউরিটি বিভাগের ডিউটি রোস্টারে ওই দিন রহস্যজনক কারণে ভিভিআইপি ফ্লাইটের জন্য আলাদা কোনো রোস্টার তৈরি করা হয়নি। প্রতিদিনের মতো সাধারণ রোস্টার তৈরি করেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এ কারণে ওই ফ্লাইটের আশপাশে কেউ ছিলেন না। এটি বিভাগের প্রধান আলী মোস্তফা মামুন ও রোস্টার তৈরির দায়িত্বে থাকা সিডিউলারের চরম গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার বিষয়টি উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

সিকিউরিটি বিভাগের একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, আলী মোস্তফা ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সিকিউরিটি বিভাগের সৎ ও সাহসী গার্ডদের বিভিন্ন শাখা থেকে তুলে এনে তার পছন্দের লোকদের দায়িত্ব দিয়েছেন। অভিযোগ আছে, সিকিউরিটি বিভাগের একটি সিন্ডিকেট তাদের পছন্দের লোকদের বিভিন্ন শাখায় ডিউটি দিয়ে বিমানের ১০টি শাখা থেকে প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা চাঁদা ওঠাচ্ছে। সোনা চোরাচালান চক্র ও বিমানের বিভিন্ন ফ্লাইটের অ্যাক্সেস ব্যাগেজ থেকেও সিকিউরিটি বিভাগ মাসে ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা মাসোয়ারা ওঠায়। এ ছাড়া সিকিউরিটি বিভাগের অধীন ইনভেস্টিগেশন সেলের মাধ্যমেও এ বিভাগ প্রতি মাসে ১ থেকে ২ কোটি টাকা অবৈধ আয় করে।

অভিযোগ আছে- বিমানের কার্গো বিভাগের রফতানি শাখার স্পেস কন্ট্রোল, কার্গো ওজন চেকিং, কার্গো আমাদানি শাখার মেইন ওয়্যার হাউস, ডেলিভারি গেট ও কার্গো প্রসিডিউর শাখায় সিকিউরিটি গার্ডদের ডিউটি রোস্টারের নামে প্রতিদিন মোটা অংকের চাঁদা ওঠাচ্ছে সিন্ডিকেট।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিমানের এয়ারপোর্ট ট্রাফিক শাখার পাসপোর্ট চেকিং ইউনিট (পিসিইউ) শাখায় পোস্টিং নিতে হলে প্রত্যেক সিকিউরিটি গার্ডকে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয় সিন্ডিকেটকে। জানা গেছে, এ শাখায় পোস্টিং নেয়া বিমানের সিকিউরিটি গার্ড প্রতিদিন আয় করছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। কোনো কোনো দিন এই টাকা লাখের অংকও ছাড়িয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে- কতিপয় অসাধু সিকিউরিটি গার্ড ও ইমিগ্রেশন শাখার যোগসাজশে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন আদম পাচার হচ্ছে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে। এ খাত থেকে প্রতিদিন গড়ে সিন্ডিকেট আয় করছে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা।

বিমানের চেকিং কাউন্টারে বিভিন্ন ফ্লাইটে গমনকারী যাত্রীদের অতিরিক্ত ব্যাগেজ মাশুল আদায়ের নামে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় করছে সিকিউরিটি বিভাগের একটি সিন্ডিকেট। বাস্তবে এ টাকা বিমানের কোষাগারে জমা হচ্ছে না। একইভাবে হারানো ও প্রাপ্তি শাখায় তাদের নিজেদের কর্মী পোস্টিং দিয়ে সিওডি ব্যাগেজের লাখ লাখ টাকা ভাড়া মাশুল আদায় করে সে টাকা বিমানের কোষাগারে জমা দিচ্ছে না।

অভিযোগ আছে- এ বিভাগের একটি সিন্ডিকেট বিমানের ট্রাফিক হেলপার, কার্গো হেলপার, লোডার, ক্লিনারসহ বিভিন্ন শাখার সাধারণ ক্যাজুয়াল কর্মীদের কাছ থেকে ব্ল্যাকমেইল করে নানা অজুহাতে আইডি কার্ড ছিনিয়ে নিয়ে প্রতিদিন মোটা অংকের আয় করছে। ছোটখাটো অজুহাত দেখিয়ে এসব কর্মীর কাছ থেকে আইডি কার্ড ছিনিয়ে নিয়ে বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার কথা বলে ১০ থেকে ২০ টাকা টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিচ্ছে। এরপর গড়ে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে আবার মামলা থেকে অব্যাহতি দিচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন মামলার তদন্তের নামেও এ শাখার একটি সেল প্রতি মাসে বিমানের বিভিন্ন শাখার কর্মীদের কাছ থেকে লাখ টাকা ঘুষ আদায় করছে। অভিযোগ আছে- তদন্ত শাখায় লুৎফুর কবির নামে এক কর্মকর্তা গত ১০ বছর ধরে তদবির করে একই পোস্টে কর্মরত আছেন। একাধিকবার বদলির অর্ডার হলেও তাকে এ বিভাগ থেকে সরানো যাচ্ছে না।

যুগান্তর

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.