স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে গত দুই বছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স থেকে সরে যেতে হয়েছে ৩১ কর্মকর্তাকে। স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে এসব কর্মকর্তাদের নাম উঠে আসায় তাদেরকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিমান কর্তৃপক্ষ।
এদের মধ্যে কাউকে বরখাস্ত ও কাউকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অনেকে আবার চাকরিচ্যুতির আভাস পেয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।
বিমান বাংলাদেশ সূত্র জানায়, এই ৩১ কর্মকর্তার মধ্যে একজনকে চাকরিচ্যুত, ২২ জনকে সাময়িক বরখাস্ত, ৪ জনকে বরখাস্ত এবং বাকি ৪ জন স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।
বরখাস্তকৃত কর্মকর্তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ পদধারী হচ্ছেন উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ইমদাদ হোসেন। আরো আছেন বিমানের ক্রু মাজহারুল আফসার রাসেল। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এমনকি সুইপারদের নামও আছে বরখাস্তের তালিকায়। এদের মধ্যে অনেকে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। কারো কারো আবার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
বরাবরই স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে বিমানের শিডিউলিং বিভাগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে। গোয়েন্দারা তদন্ত করে পেয়েছেন, বিমানের শিডিউল বিভাগের কর্মকর্তারা চোরাচালানের ফ্লাইটের সময় নিজেদের লোককে দায়িত্ব দেয়। এ ধরনের অভিযোগের কারণে বিমান থেকে সরে যেতে হয়েছে চিফ অব শিডিউলিং অ্যান্ড প্ল্যানিং ক্যাপ্টেন আবু মো. আসলাম শহীদ, ম্যানেজার ফ্লাইট শিডিউলিং তোজাম্মেল হোসেন, জুনিয়র শিডিউলিং অফিসার মো. নাসির উদ্দিন ও শিডিউলিং অ্যাসিস্ট্যান্ট মতিউর রহমানকে।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহা-ব্যবস্থাপক শাকিল মেরাজ বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কখনোই অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয় না। চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। ভবিষ্যতেও এমন অভিযোগ থাকলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
চোরাচালানের অভিযোগ ঘাড়ে নিয়ে বিমান ছেড়েছেন এয়ারক্রাফট মেশিন অ্যাসিস্ট্যান্ট আনিস উদ্দিন ভুঁইয়া, এয়ারক্রাফট মেশিন নিয়াজ মাহমুদ, জুনিয়র টেকনিশিয়ান মো. মাসুদুর রহমান, এয়ারক্রাফট মেশিন মো. মিলন খন্দকার, জুনিয়র ইনশপেকশন অফিসার শাহজাহান সিরাজ, জুনিয়র ইনশপেকশন অফিসার এস এম এ হালিম, ক্যাজুয়াল সুইপার জয়নাল আবেদিন, এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. নুরুল ইসলাম, ক্যাজুয়াল এ/সি, এমইসিএইচ এ শহীদুজ্জামান, জুনিয়র সেক্রেটারি অফিসার কে এম কামরুল হাসান, ক্যাজুয়াল ক্লিনার শুকলাল, ক্যাজুলার ক্লিনার জীবন কুমার দাস, এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. আবু সালেহ, টেকনিক্যাল অফিসার মো. আমিরুল ইসলাম, এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. আক্তারুজ্জামান, এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. আনোয়ারুল আহসান, জুনিয়র টেকনিশিয়ান মো. ওসমান গনি, এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. সালেহ আহমেদ খান, এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. ইমরানুল ইসলাম, একাউন্ট সুপারভাইজার মঞ্জুর মোর্শেদ, এফএসএস নুরজাহান বেগম, ইঞ্জিনিয়ার অফিসার সালেহ উদ্দিন, এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. আব্দুস সাত্তার ও সুইপার মো. আবু জাফর।
২৬ জনের মধ্যে কেউ কারাগারে রয়েছেন, কয়েকজন আবার জামিনে বাইরে আছেন। তবে বাকি ৫ কর্মকর্তার হদিস নেই পুলিশ কিংবা বিমানের কাছে। সেই ৫ জন হচ্ছেন জুনিয়র সিকিউরিটি অফিসার কামরুল হাসান, ক্লিনিং সুপারভাইজার আবু জাফর, মেকানিক মাসুদুর রহমান, প্রকৌশল হ্যাঙ্গারের মেকানিক ওসমান গনি ও হ্যাঙ্গারের কর্মী রায়হান।
২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর নিজের জুতার মধ্যে করে আড়াই কেজি স্বর্ণ আনার অভিযোগে আটক হন বিমানের কেবিন ক্রু রাসেল। মূলত রাসেল আটক হওয়ার পরপরই ফাঁস হয় বিমানের কর্মকর্তাদের চোরাচালান সিন্ডিকেটে জড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তার দেয়া তথ্যেই গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে আটক হয় বিমানের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ইমদাদ হোসেন, প্ল্যান ও শিডিউল চিফ ক্যাপ্টেন শহীদ এবং ম্যানেজার তোজাম্মেল হোসেন।
এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) তারিক আহমেদ বলেন, অনেকসময় বিমানের কর্মকর্তারা লোভে পড়ে চোরাচালান সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ে। সেসব সিন্ডিকেটে একবার কেউ ঢুকে পড়লে আর বের হতে পারে না। এভাবেই চোরাচালানের কাজে সহযোগিতা করতে করতে একসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা তারা গ্রেফতার হন।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে বিমান কর্মকর্তাদের এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে না জড়ানোর পরামর্শ দেন এএসপি তারিক।
জাগো নিউজ