‘ঋণের উচ্চ সুদহার দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি’
এর ফলে মূলধন অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এ ছাড়া ব্রেক্সিট কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অস্থিরতার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
বৈশ্বিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে তেলের দাম বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান কমে আসার কারণেও অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
রাজধানীর হোটেল রেডিসন ব্ল–তে সোমবার এডিবি আয়োজিত ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব ফরিদা নাসরিন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থান করেন এডিবির চিফ ইকোনমিস্ট ড. ইয়াসুকি সোয়াদা।
আউটলুকে বলা হয়েছে, চলতি বছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হার হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বেশ কয়েকটি পরামর্শও দেয়া হয়েছে। কর্মবাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে এডিবি। এজন্য শ্রম নীতিমালা হালনাগাদ করা ও তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও তাগিদ দেয়া হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতিতে আগামীতেও পোশাক খাতের সম্ভাবনাকেই বড় করে দেখছে এডিবি। পাশাপাশি চামড়া শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত ঘিরে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে। এসব খাতে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা ও যোগাযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোট সাসেক ও বিমসটেক আরও জোরদার করার তাগিদও দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
আউটলুকে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০১৯ সাল শেষে প্রবৃদ্ধি হবে ৭.৫ শতাংশ। এটি আগের বছরের চেয়ে কিছুটা কম। ২০১৮ তে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল সংস্থাটি। পূর্বাভাস কমানোর কারণ হিসাবে বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এ প্রবৃদ্ধি হবে। এশিয়া অর্থনীতিতে বড় নীতিবাচক প্রভাব পড়বে চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ। এর প্রভাব বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতেও পড়তে পারে। এতে আরও বলা হয়, মার্কিন বাজারে চীনের পণ্য রফতানি কমলেও এশিয়া থেকে কমবে না। এজন্য বাংলাদেশ রফতানির সুযোগ নিতে পারে। এজন্য পণ্য বহুমুখীকরণের দিকে যেতে হবে।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশ বলেন, বাংলাদেশ গত ১০ বছর থেকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে গত তিন বছর টানা ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এটা দারুণ ব্যাপার। তিনি বলেন, কয়েকটি বিষয়ে নজর দিলে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে। এজন্য বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নিচের অংশ বাড়াতে রফতানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণেও মনোযোগ বাড়াতে হবে। কারণ অভ্যন্তরীণ চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ জন্য অবকাঠামা দুর্বলতা কাটানো, আর্থিক নীতিমালা সংস্কার ও রফতানি বাড়াতে বাজার এবং পণ্য বহুমুখীকরণে নজর দিতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, মার্কিন ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধে এশিয়ার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু সঠিক উদ্যোগ নিতে পারলে এ থেকে উপকৃত হওয়াও সম্ভব। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত ভালো করছে, এটি দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত। আমরা পণ্য বহুমুখীকরণে উদ্যোগ নিয়েছি। এ খাতে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার ব্যবসাবান্ধব, ব্যাপক বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। ডুয়িং বিজনেস উন্নয়নে অনেক উদ্যোগ রয়েছে। করসংক্রান্ত বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
ড. মশিউর রহমান বলেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা মানুষের কর্মসংস্থান কমাবে।
কিন্তু জনশক্তিকে প্রশিক্ষিত করতে পারলে অবশ্যই নতুন শিল্প ক্ষেত্র ও কাজের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। উৎপাদনে বৈচিত্র্যতা আনতে হলে মানুষের প্রয়োজন আছে। তিনি বলেন, সরকার জনসংখ্যার বোনাস কালকে কাজে লাগাতে চায়। এজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এ ছাড়া দারিদ্র্য নিরসনের হারও কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর মাথাপিছু আয় বাড়লেও চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। সম-অর্থনীতির ভিয়েতনামে রফতানি আয় আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। যদিও গত ছয় মাসে আমাদের রফতানির চিত্র ভালো নয়। উদ্যোক্তা তৈরি, বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।