ওয়ার্ক পারমিট নেই। তারপরও অন্যদের চেয়ে ৩ গুণ বেশি বেতন নিয়ে দিব্যি বাংলাদেশ বিমানে কাজ করছেন ৩ বিদেশী পাইলট। তারা হলেন ক্যাপ্টেন আটওয়া, ক্যাপ্টেন হাতেম ও ক্যাপ্টেন ওসমান। প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা বেতন নিচ্ছেন তারা। অথচ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রুটের অন্য পাইলটদের বেতন মাসে সর্বোচ্চ ৭ লাখ টাকা। অভ্যন্তরীণ রুট পরিচালনার জন্য মিসরের স্মার্ট এভিয়েশন থেকে দুটি ড্যাশ-৮ কিউ ৪০০ উড়োজাহাজ ভাড়া নেয়া হয়েছিল। সেগুলো পরিচালনা ও দেশীয় পাইলটদের প্রশিক্ষণ দিতে ৬ মাসের জন্য ওই তিন মিসরীয় পাইলটকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কথা ছিল ৬ মাসের মধ্যে বিমান নিজস্ব পাইলট নিয়োগ দেবে। এরপর তিন বিদেশী পাইলটকে বিদায় দেয়া হবে। কিন্তু বিমান কর্তৃপক্ষ দেড় বছরেও ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য নিজস্ব পাইলট নিয়োগ দিতে পারেনি। এ অবস্থায় বেতন বাড়িয়ে দিয়ে ৬ মাস পর পর ৩ পাইলটের চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। জানা গেছে, এক বছর ধরে অবৈধভাবে উড়োজাহাজ চালানোর বিপরীতে তাদের বেতন-ভাতাদিও পরিশোধ করা হচ্ছে অবৈধ পন্থায়। ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় তাদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে বিমানের লন্ডনের অ্যাকাউন্ট থেকে।
এ সম্পর্কে জানতে বিমানের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) ইনামুল বারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন বলে জানান। পাইলটদের সংগঠন বাপার সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহাবুবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, কোনো কিছু জানতে হলে বিমানের পাবলিক রিলেশন্স বিভাগে যোগাযোগ করতে হবে। পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ লিখিতভাবে প্রশ্ন দিতে বলে।
অভিযোগ আছে, মূলত কমিশন বাণিজ্যের জন্যই বিমানের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এ ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে বিদেশী পাইলট নিয়োগ দিচ্ছে। কারণ কাগজে-কলমে ১০/১২ লাখ টাকা বেতন দেখানো হলেও মাস শেষে সংশ্লিষ্ট বিদেশী পাইলটদের হাতে পৌঁছে মাত্র ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। বাকি টাকা হাতবদল হয় সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের একজন সিনিয়র পাইলট জানান, বিমান কর্তৃপক্ষ যেসব বিদেশী পাইলট নিয়োগ দিচ্ছে তাদের অধিকাংশই নিজেদের দেশে ভালো কোনো এয়ারলাইন্সে চাকরি পাচ্ছেন না। অধিকাংশেরই বয়স বেশি, প্রয়োজনীয় ফিটনেস নেই। এ কারণে তারা কম বেতনে এসব সিন্ডিকেটের কথায় রাজি হয়ে যান। জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের বেশিরভাগ সদস্যই বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) নির্বাচিত সদস্য। এরাই দীর্ঘদিন বিমানে পাইলট নিয়োগ বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রেখেছেন। এরপর ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই উচ্চ বেতনে বিদেশী পাইলটদের দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন। এ কারণে আর্থিক লোকসানের পাশাপাশি বিমান এখন বড় ধরনের পাইলট সংকটে পড়েছে। সম্প্রতি পুরস্কার হিসেবে এই সিন্ডিকেটের ৩ সদস্যকে বাপার অপারেশন ম্যানুয়েল ভঙ্গ করে অবৈধভাবে ফ্লাইট অপারেশন শাখার শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যার নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন বাপার সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুব।
এ বিষয়ে বিমানের প্রশাসন শাখা থেকে জানানো হয়, বিমানে বিদেশী কোনো নাগরিককে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করতে হলে সবার আগে বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ড থেকে ওয়ার্ক পারমিট নেয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করলে তাদেরকে বৈধভাবে কোনো ধরনের বেতন-ভাতাও পরিশোধ করা যায় না। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তারপরও বিমান দেড় বছর ধরে এই তিন মিসরীয় পাইলটকে লন্ডন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বেতন-ভাতা পাঠাচ্ছে।
এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ে খোদ বিমানের ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠছে। বিমানের ফ্লাইট অপারেশন শাখা থেকে জানানো হয়, স্মার্ট এভিয়েশন থেকে লিজে আনা দুটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজের যে চুক্তি করা হয় তার অধিকাংশ শর্তই ছিল বিমানের স্বার্থবিরোধী। কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা বেশি দিয়ে উড়োজাহাজ দুটি লিজ নেয়া হয়েছিল। জানা গেছে, গত বছর এপ্রিলে মিসরের ছয়জন পাইলটসহ দুটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ লিজ নেয় বিমান। চুক্তিতে শর্ত ছিল প্রথম ছয় মাস ৬ জন বিদেশী পাইলট চুক্তিভিত্তিক কাজ করবেন। এ সময়ের মধ্যে বিমান নিজস্ব পাইলট নিয়োগ দিয়ে তাদেরকে ড্যাশ-৮ চালানোর জন্য তৈরি করবে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বাপার সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহাবুবের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিছু দিন আগেও সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ৮ জন পাইলট নিয়োগ দেয়ার সময় বাপা সভাপতির নেতৃত্বে বাধা দেয়া হয়। এতে ভণ্ডুল হয়ে যায় ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া। বাধ্য হয়ে বিমান ম্যানেজমেন্টকে নিজস্ব বোয়িং ৭৭৭-এর তিন ফার্স্ট অফিসারকে ড্যাশ-৮ এর পাইলট হিসেবে নিয়োগ দিতে হয়। যার কারণে স্মার্ট এভিয়েশনের তিনজন পাইলট ৬ মাসের মাথায় চলে যান। কিন্তু প্রয়োজনীয়সংখ্যক পাইলট না থাকায় বাকি তিনজনকে এখনও উচ্চ বেতনে রেখে দিতে হয়েছে। বিমানের পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ তিন পাইলটকে যে পরিমাণ বেতন দেয়া হচ্ছে- সে টাকায় দেশীয় ১০ জন দক্ষ পাইলট নিয়োগ করা সম্ভব। গত এক বছরেও কেন ড্যাশ-৮ এর জন্য পাইলট নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হয়নি তা জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের একজন পরিচালক বলেন, বিমান একাধিকবার দেশীয় পাইলট নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। প্রতিবারই বাপা তাতে প্রবল আপত্তি তুলেছে। এসবের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কমিশন বাণিজ্য।
সূত্রঃ যুগান্তর