সংকটের অর্থনীতিতে ‘বোয়িং বিলাস’—নীতির সাথে বাস্তবতার সংঘর্ষ

কালের কন্ঠের রিপোর্ট নিয়ে সম্পাদকীয়

সংকটের অর্থনীতিতে ‘বোয়িং বিলাস’—নীতির সাথে বাস্তবতার সংঘর্ষ

বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বহুমুখী চাপে নড়বড়ে, তখন বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ নিয়ে নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং ধীর প্রবৃদ্ধির বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনাকে অনেকেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে পারছেন না। বরং এটি সরকারের ঘোষিত কৃচ্ছ্রসাধন নীতির সঙ্গে এক ধরনের সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে—এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা, সম্ভাব্য শুল্ক চাপ এড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে বিমান বহর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কৌশলগত প্রয়োজন থাকলেও তার সময় কি এখন? অর্থনীতি যখন টিকে থাকার লড়াই করছে, তখন বিলিয়ন ডলারের দায় নেওয়া কতটা যৌক্তিক—এই বিতর্ক এড়ানো যাচ্ছে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যমান ঋণের বোঝা পুরোপুরি শোধ না করেই নতুন ঋণে যাওয়ার প্রবণতা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এখনও আগের কেনা উড়োজাহাজের পুরো অর্থ পরিশোধ করতে পারেনি। এর মধ্যে আবার নতুন করে হাজার হাজার কোটি টাকার দায় যুক্ত হলে তা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে—এটা অনুমান করা কঠিন নয়।

বিশেষজ্ঞদের আরেকটি যুক্তি উপেক্ষা করা যাচ্ছে না—বাংলাদেশের বাস্তবতায় দীর্ঘপাল্লার বড় উড়োজাহাজের চেয়ে স্বল্প ও মধ্যম দূরত্বের রুটে ছোট উড়োজাহাজ বেশি কার্যকর। অথচ ক্রয় তালিকায় বড় ড্রিমলাইনারের আধিক্য দেখা যাচ্ছে, যার পরিচালন ব্যয়ও অনেক বেশি। ফলে লাভজনকতা নিশ্চিত না হলে এই বিনিয়োগ ‘সম্পদ’ না হয়ে ‘বোঝা’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে এটাও সত্য, একটি জাতীয় বিমান সংস্থাকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আধুনিকায়ন ও বহর সম্প্রসারণ অপরিহার্য। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত হতে হবে আর্থিক সক্ষমতা, বাজার চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। কেবল কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপের কারণে নেওয়া সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। চুক্তির শর্ত, অর্থায়নের কাঠামো, সম্ভাব্য ঝুঁকি—সবকিছু জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা উচিত। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং বিকল্প অপশন বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সংক্ষেপে, উড়োজাহাজ কেনা নিজেই সমস্যা নয়; সমস্যা হচ্ছে সময়, প্রেক্ষাপট এবং অগ্রাধিকার। অর্থনীতি যখন সংকটে, তখন প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তকে আরও সতর্কতা, বাস্তবতা ও দায়বদ্ধতার আলোকে নিতে হবে। অন্যথায় ‘বোয়িং বিলাস’ একসময় জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.