বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান কার্যালয় বলাকা’য় বুধবার ‘স্তন ক্যানসার সচেতনতা’ বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এ্যাকশন অন ক্যান্সার প্রিভেনশন এবং ক্যান্সার রোগী ও স্বজনসমাজ ফাউন্ডেশন-এর পরিচালনায় বিমান শ্রমিক লীগ (সিবিএ) এবং বিমানের অন্যান্য সকল এ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনায় এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সিবিএ’র সভাপতি মশিকুর রহমান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিমান পরিচালনা পর্ষদ-এর চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী (অবঃ) এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এ.এম. মোসাদ্দিক আহমেদ। সেমিনারে বিমানের সকল স্তরের মহিলা কর্মকর্তা/কর্মচারীগণ অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে ‘স্তন ক্যান্সার সচেতনতা’ বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয় এবং ‘স্তন ক্যান্সার’ থেকে মুক্ত হওয়া কয়েকজন সারভাইভরকে পুরস্কার দেওয়া হয়। সেমিনারে বিমানের পরিচালক প্রশাসন এবং পরিচালক বিপণন ও বিক্রয়সহ অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, সারা বিশ্বে ২০০৪ সালে এই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ লাখ ১৯ হাজার নারী মৃত্যুবরণ করেন। এটি মোট মৃতের শতকরা ১ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে প্রতিবছর দুই লাখ ১৬ হাজার নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তার মধ্যে ৪০ হাজার নারী মারা যান। বাংলাদেশেও ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা কম নয়। আমাদের দেশে প্রায় ২২ হাজার নারী এ ক্যানসারে প্রতিবছর প্রাণ হারান। অসচেতনতাই এর মূল কারণ। একটু সচেতন হলেই আমরা রক্ষা করতে পারি আমাদের প্রিয় মুখগুলো। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিবছরের মতো দেশে আজ পালিত হচ্ছে স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবস।
স্তন ক্যানসার নারীর জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হলেও এটি কিন্তু অনেক ক্যানসারের তুলনায় ভালো। যেমন : অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের কথাই ধরা যাক, এটা এমনই মারাত্মক ক্যানসার যে বোঝার কোনো উপায়ই থাকে না। একেবারে শেষের দিকে এটি ধরা পড়ে। আর যখন ধরা পড়ে, তখন করার কিছুই থাকে না। অথচ একটু সচেতন হলেই এ ক্যানসার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আবার এ ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও যদি ক্যানসারের শুরুতে রোগনির্ণয় করে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়, তাহলে কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ মানুষের মতো জীবনযাপন করা সম্ভব। সঠিক সময়ে ও সঠিকভাবে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা করানো সম্ভব হলে রোগমুক্ত হয়ে ১০ বছর বেঁচে থাকার হার প্রায় ৯৮ ভাগ। এ ক্যানসার নির্ণয় করার জন্য বেশ কিছু ভালো পদ্ধতি আছে। একটি জিনিস মনে রাখতে হবে, স্তন ক্যানসার শুরুতে নির্ণয় করে চিকিৎসা করাতে পারলে যেমন প্রাণে বাঁচা সম্ভব হয়, কিন্তু যদি এ ক্যানসার বেশি দিন ধরে নির্ণয় করা না হয় বা চিকিৎসা করা না হয়, তাহলে রোগীর মৃত্যু অবধারিত।
স্তন ক্যান্সার সনাক্ত করার উপায় : স্তন ক্যানসার নির্ণয়ে আপনি একজন চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। এ জন্য মাসে আপনাকে কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করতে হবে। নিজে নিজে আপনার স্তন পরীক্ষা করুন। ঋতুস্রাব শুরু ৭-১০ দিন পর বা মাসিক শেষ হওয়ার তিন দিন পর স্তন পরীক্ষা করা সবচেয়ে ভালো সময়। এ সময় স্তনের তরল কমে যায় ও কোষের বৃদ্ধি কমে যাওয়ায় স্তনে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে তা ভালোভাবে বোঝা যায়। শরীরের ওপরের অংশ থেকে কাপড় খুলে দুই হাত পাশে রেখে আয়নার সামনে বসুন। এবার ভালোভাবে লক্ষ করুন, স্তনে কোনো অস্বাভাবিকতা, যেমন—দুটো স্তনের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য আছে কি না, স্তনের আকার-আকৃতি ও রঙের পরিবর্তন, দুটো নিপল বা স্তন বোঁটা একই লাইনে আছে কি না, নিপল ভেতরে ঢুকে গেছে কি না, স্তনের ত্বকে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় কি না, নিপল থেকে রক্তিম বা পানির মতো কিছু বের হয় কি না।
এবার হাত আস্তে আস্তে মাথার ওপরে তুলুন। দেখুন স্তনের ত্বক কমলালেবুর খোসার মতো মনে হচ্ছে কি না। কোনো চাকা দেখা যায় কি না। এবার পুরো স্তনকে চার ভাগ করে প্রত্যেক ভাগ হাতের আঙুল দিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করুন। হাতে চাকার মতো কিছু লাগে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করুন। যদি স্তনে কোনো চাকা বা ওপরের সমস্যাগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। এভাবে প্রতি মাসে একবার স্তন নিজে নিজে পরীক্ষা করুন। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু এ পরীক্ষার মাধ্যমেই স্তন ক্যানসার শুরুতে নির্ণয় করার মাধ্যমে অনেকের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। গবেষকরা বলেছেন, ২০ বছরের সব নারীকে মাসে অন্তত একবার নিজের স্তন নিজেই পরীক্ষা করতে হবে। ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে বছরে অন্তত একবার চিকিৎসকের মাধ্যমে স্তন পরীক্ষা করাতে হবে। আর ৪০ বছরের কম বয়সীরা তিন বছরে একবার চিকিৎসকের মাধ্যমে স্তন পরীক্ষা করাতে হবে। এ ছাড়া ম্যামোগ্রামের মাধ্যমে নির্ণয় করা যেতে পারে স্তনের ক্যানসার। ম্যামোগ্রাম হলো স্তনের এক্স-রে। হাতের সাহায্যে স্তনের খুব ছোট চাকা নির্ণয় করা না গেলেও এর মাধ্যমে তা নির্ণয় করা যায়। শতকরা ৮৫-৯০ ভাগ স্তন ক্যানসার এ পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়।
ম্যামোগ্রাফির মাধ্যমে স্তন ক্যানসার শুরুতে নির্ণয় করায় নারীদের স্তন ক্যানসারে মৃত্যুর হার কমেছে ২০-৩০ ভাগ। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির মতে, প্রত্যেক নারীকে ৪০ বছর বয়সে একবার ম্যামোগ্রাম করা প্রয়োজন। এর পর থেকে প্রতিবছর একবার করে এ পরীক্ষা করার ব্যাপারে তারা সুপারিশ করেছে। যদি কারো ক্যানসারের লক্ষণ বা ঝুঁকি থাকে, যেমন—কারো মা, বোনের ক্যানসার ধরা পড়ে, তাঁদের ৩৫ বছর বয়সে প্রথমবার ম্যামোগ্রাফি করাতে হবে। এর পর থেকে বছরে একবার করে এ পরীক্ষা করতে হবে। তরুণীদের স্তনে ঘন স্তন টিস্যু থাকার কারণে ম্যামোগ্রাফির মাধ্যমে ক্যানসার নির্ণয় করা যায় না। এ ক্ষেত্রে ক্যানসার ঘন স্তনের মধ্যে ঢাকা পড়ে। তরুণীদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই, তাঁদের ক্যানসার যদি হয়েও থাকে তা শুরুতে নির্ণয় করা যায় স্তন আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে। এ ছাড়া আছে এমআরআই। এটি সবচেয়ে আধুনিক পরীক্ষা। অনেকে মনে করেন, ম্যামোগ্রাম এক্স-রে পরীক্ষা বলে তা বারবার করালে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে, ম্যামোগ্রাম করালে কোনো প্রকার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে না। তাই এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই।
সংকোচ করবেন না : অনেকেই স্তনে কোনো রোগ হলেও সংকোচে চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। ফলে ধীরে ধীরে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে শুরু করে। এমনও দেখা যায় যে, শুধু সংকোচের কারণেই ক্যানসার জটিল আকার ধারণ করে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সংকোচ করবেন না। স্তনে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ক্যানসার গবেষণার দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের প্রতিবেদন বলছে, প্রতিবছর বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮২২ জন, মারা যান ৭ হাজার ১৩৫ জন। নারী ক্যানসার রোগীদের মধ্যে আক্রান্তের ও মৃত্যুর হার যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৯ ও ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০১৪ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারী ক্যানসার রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি (২৭.৪%) স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত। নারী-পুরুষনির্বিশেষে এই ক্যানসারের স্থান দ্বিতীয় (১২.৫%)। স্তন ক্যানসারের রোগীদের গড় বয়স প্রায় ৪৩ বছর।
স্তন ক্যানসারের লক্ষণ: স্তনে চাকা বা পিণ্ড, নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া, অসমান বা বাঁকা হয়ে যাওয়া, নিপল দিয়ে অস্বাভাবিক রস বা রক্তক্ষরণ হওয়া, চামড়ার রং বা চেহারায় পরিবর্তন, বগলের নিচে পিণ্ড বা চাকা থাকলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
চিকিৎসকেরা সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের এক, দুই বা তিন বছর পরপর নিয়মিতভাবে ম্যামোগ্রাম করার পরামর্শ দেন। এর মাধ্যমে স্তনে খুব ছোট চাকা বা অন্যান্য অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়ে। ২০ বছর বয়স থেকে সারা জীবন প্রতি মাসে একবার নিজের স্তন পরীক্ষা এবং স্তনে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন ধরা পড়লেই চিকিৎসক অথবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে স্তন পরীক্ষা করাতে বলেন।
বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরামের প্রধান সমন্বয়কারী ও জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, স্তন ক্যানসার এক নীরব ঘাতক। তবে সঠিক সময়ে শনাক্ত হলে এর প্রতিকার সম্ভব।