নির্বাচনী সহিংসতা নারীকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করে

নির্বাচনী সহিংসতা নারীকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করে।

বাঙালি নির্বাচনমুখী জাতি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তারা নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পছন্দ করে। তাই সারা দেশেই এখন নির্বাচনী আমেজ। এই উৎসবের আমেজের মধ্যে দেশজুড়ে নির্বাচনী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। নাগরিক হিসেবে, একজন নারী হিসেবে এই সহিংসতা ক্রমাগত উদ্বিগ্ন করছে।

প্রাক্–নির্বাচনী যে সহিংসতা চলছে, সেটা নির্বাচনের সময় ও নির্বাচনের পরে কোন অবস্থায় পৌঁছাবে, তা নিয়ে উদ্বেগটা আরও বেশি। অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু নারীদের বিপদগ্রস্ত হতে হয়। সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও ক্রমাগত শঙ্কা দানা বাঁধছে। বিরোধী প্রার্থী ও সমর্থকদের নানাভাবে হয়রানি ও হেনস্তা করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

বর্তমান বাস্তবতায় নারী, সংখ্যালঘু ও তরুণ ভোটার—এই তিনটি গোষ্ঠী বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটি গোষ্ঠী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলবে। নারী ভোটারের ভোট দেওয়া কোনো না–কোনোভাবে উৎকণ্ঠার জায়গা তৈরি করে। পুরো নির্বাচনব্যবস্থা যেখানে অর্থ ও পেশিশক্তির কাছে হার মেনে যাচ্ছে, সেখানে নারীর ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি তাঁদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

নারী শুধু ভোটার নন, প্রার্থীও হতে পারেন। এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা খুবই কম। দলগুলো অল্প কিছু নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এমন এমন জায়গায় নারী প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, যেখানে দলের জেতার সম্ভাবনা খুবই কম। এটা একধরনের সমঝোতার কৌশল।

নারীকে প্রার্থী করতে হবে বলে করা। নারীকে জয়ী করার জন্য দলকে যে কষ্ট করতে হয়, তা করতে দলগুলো কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

নারী আন্দোলনকর্মী হিসেবে বলতে চাই, নারী তাঁর পথ খুঁজে নিতে জানে, যদি তাঁকে সুযোগ দেওয়া হয়। নারীদের সে সুযোগ দেওয়া হয়নি। এটাই দুঃখের বিষয়। ক্ষমতায়নের কথা বলে নারীকে প্রার্থী হিসেবে আনার ক্ষেত্রে আমাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। পরিবার ও সমাজেও অনীহা আছে।

রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে আগামীর দিকনির্দেশনা দেবে। ইশতেহার যেন শুধু উন্নয়নের ফুলঝুরি না হয়, সামাজিক উন্নয়নের যেসব ক্ষেত্রে ক্রমাগত বৈষম্য বাড়ছে, সেসব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। এসব বৈষম্যের লাগাম কীভাবে টানবে, সেসব দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।

আমরা বারবার দাবি তুলেছি, সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন করতে হবে। আমাদের সে আশা পূরণ হয়নি। আশা করব, কবে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন করা হবে, এ বিষয়ে দলগুলো এবার একটা পথনকশা (রোডম্যাপ) দেবে।

নারীর ক্ষমতায়নের সূচিত ধারাগুলো যেন মধ্যপথে থেমে না যায়। নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ–সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সিডও সনদে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা এখন পর্যন্ত মেনে নেয়নি। এ বিষয়ে দলগুলোকে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া নারীদের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। নারীকে শুধু অংশগ্রহণকারী হিসেবে না দেখে অংশীদারত্বের জায়গায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাঁদের নিয়ে আসার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নারী ভোট দিলেও তাঁর ভোট গণনার মধ্যে আসবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা দানা বাঁধছে। দেশের আপামর জনগোষ্ঠী শান্তিপ্রিয়, নির্বাচনমুখী। তারা একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। আশা করছি, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের হাতে, তাঁরা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে একটি সুন্দর নির্বাচন জাতিকে উপহার দেবেন।

লেখক: , নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.