পাসপোর্ট ছাড়াই বিমানের পাইলটের কাতার যাওয়া নিয়ে রহস্য।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের পাইলট ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ বুধবার পাসপোর্ট ছাড়াই কাতার যাওয়ায় বড় ধরনের রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। ফজল মাহমুদকে পাসপোর্ট ছাড়া ইমিগ্রেশন পার হওয়ার অনুমতি দেয়ায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগের বেশ কয়েক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ।
এ ঘটনা তদন্তে ৪ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে পৃথক কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি বিমানকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া শুক্রবার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চার সদস্যের এ তদন্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরাপত্তা ও বহিরাগমন) মো. আজহারুল হককে। তদন্ত কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে সুরক্ষা সেবা বিভাগে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট নিয়ে এত বড় ঘটনার পরের দিন বৃহস্পতিবার ফ্লাইট নিয়ে রহস্যজনকভাবে দাম্মাম গেছেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্যাপ্টেন জামিল আহমেদ। এ কারণে কমিটির সদস্যদের নাম প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে। বিমান এমডি দেশে ফিরে আসার পর বিমান গঠিত তদন্ত কমিটির নাম ঘোষণা করা হতে পারে। শুক্রবার তার দেশে ফিরে আসার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, বিদেশ সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনতে বুধবার রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বোয়িং ৭৮৭ মডেলের ড্রিমলাইনারে চড়ে দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান পাইলট ফজল মাহমুদ, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ, একজন ফাস্ট অফিসার ও ১২ জন কেবিন ক্রু। সেখানে দেখা যায়, ফজল মাহমুদ পাসপোর্ট ছাড়াই কাতার গেছেন। যেটি ধরা পড়ে দেশটির ইমিগ্রেশনে।
পরে তাকে কিছুক্ষণ ইমিগ্রেশনে আটকে রেখে পাশের একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। কাতার ইমিগ্রেশন থেকে তাকে জানানো হয়, পাসপোর্ট দেখানোর পরই দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। পরে বেসরকারি বিমান সংস্থা রিজেন্ট এয়ারওয়েজের মাধ্যমে তার পাসপোর্ট কাতারে পাঠানো হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, পাসপোর্ট ছাড়া কারও দেশত্যাগ কিংবা অন্য দেশে প্রবেশের সুযোগ নেই। ফজল মাহমুদ কাতার ইমিগ্রেশনকে জানান, তার পাসপোর্ট বিমানের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগে তার রুমের লকারে। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টি বিমান এমডি ও বিমানের পরিচালক (ফ্লাইট অপারেশন) ক্যাপ্টেন জামিল আহমেদকেও জানান।
পরে বিমান এমডির নির্দেশে বিমানের নিরাপত্তা মহাব্যবস্থাপকের কাছ থেকে বিকল্প চাবি নিয়ে ফজল মাহমুদের পাসপোর্ট উদ্ধার করেন বিমানের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ মহাব্যবস্থাপক (জিএম সেন্ট্রাল কন্ট্রোল) আশরাফ হোসেন। তিনি জানান, বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন জামিল আহমেদের নির্দেশনা মোতাবেক তিনি পাসপোর্ট উদ্ধার করেন এবং পাসপোর্টটি কাতারে পাঠানোর উদ্যোগ নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাইলট ফজল মাহমুদের পাসপোর্ট রহস্য যেহেতু একাধিক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সেহেতু এ ঘটনা নিয়ে মূল তদন্ত করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব গাজী তারিক সালমন স্বাক্ষরিত এক আদেশে শুক্রবার বলা হয়, পাসপোর্ট ছাড়া পাইলট ফজল মাহমুদের দোহা ভ্রমণের কারণ অনুসন্ধান করবে কমিটি।
একই সঙ্গে কমিটি শাহজালাল বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার কারণ নিরূপণ করবে। চিহ্নিত করবে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের ত্রুটি। কমিটি জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। কমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নাসিমা বেগম, সদস্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের যুগ্ম-সচিব (রাজনৈতিক-৪) মো. হেলাল মাহমুদ শরীফ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী। কমিটির সদস্য সচিব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম-সচিব (রাজনৈতিক-১) মো. জাহাঙ্গীর আলম।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই ঘটনায় ইতিমধ্যে ইমিগ্রেশন বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এছাড়া সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে ইমিগ্রেশন পুলিশ বলেছে, বিমানবন্দর পার হওয়ার সময় পাইলট ফজল মাহমুদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করেননি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের পাইলট হওয়ায় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাও তার বিষয়ে ছিলেন নমনীয়। তাদের ধারণা ছিল, যেহেতু তারা প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের পাইলট সেহেতু তাদের সব ধরনের ক্লিয়ারেন্স আছে।
এদিকে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, উদাসীনতা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল তা উদঘাটন নিয়ে কাজ শুরু করেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। ইতিমধ্যে ফজল মাহমুদের ব্যক্তিগত ফাইল তলব করেছে বিমান মন্ত্রণালয়সহ সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। আগামীকাল অফিস খোলার পর এ নিয়ে কাজ শুরু করবে বিমান মন্ত্রণালয়ও। একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটিও গঠন করার কথা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক বলেন, এটি বড় ধরনের একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনা যাতে আর না হয় সেজন্য বিমান মন্ত্রণালয় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনা, পাইলট ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, উদাসীনতা নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল এই বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে আমরা তদন্ত করব।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট নিয়ে এর আগেও একাধিকবার নানা ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে তদন্ত কমিটিও হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। উল্টো এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাইলটদের সংস্থার শীর্ষ কর্তা হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। অভিযোগ আছে, ভালো ও দক্ষ পাইলট-ক্রুদের অধিকাংশ সময় এসব ভিভিআইপি ফ্লাইটে দেয়া হচ্ছে না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের প্রধান পাইলটকে নিয়ে এত বড় ঘটনা ঘটার পরও বৃহস্পতিবার বিমান এমডির দামাম্ম যাত্রা নিয়ে রহস্য দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমান এমডি হিসেবে তার ওই দিন দেশের বাইরে যাওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। এ নিয়ে বিমানের একাধিক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, পাইলট ফজল মাহমুদকে কাতারের ইমিগ্রেশন আটকে দেয়ার পর বিষয়টি ফজল মাহমুদ প্রথমে বিমান এমডি ও পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন জামিল আহমেদকে জানিয়েছিলেন। এরপর বিমান এমডি বিষয়টি গোপন রেখে ফজল মাহমুদের অফিসের লকার থেকে পাসপোর্ট নিয়ে একটি বিদেশি এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ওই বিদেশি এয়ারলাইন্স সরকারের অনুমোদন ছাড়া পাসপোর্ট নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। ঘটনাটি বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা ১৫ মিনিটে প্রথমে দৈনিক যুগান্তরের অনলাইনে শীর্ষ খবর হিসেবে প্রকাশিত হয়। এ সময় বক্তব্য জানতে বিমান এমডিকে একাধিকবার টেলিফোন করা হলেও তিনি প্রতিবেদকের ফোন রিসিভ করেননি। ওই সময় বিষয়টি সম্পর্কে জানতে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হককে জানানো হয়। এরপরই মূলত ঘটনাটি নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগ আছে বিমানের বর্তমান এমডি একজন পাইলট হওয়ায় তার পক্ষের একাধিক পাইলট কর্মকর্তা কোনো ধরনের আইন-কানুনের তোয়াক্কা করেন না। তারা নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকেন। এ কারণে বিমানের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এখানে বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) নেতাদের কথা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। অভিযোগ আছে- বাপা নেতাদের কথা না শোনায় বিমানের এয়ারবাসের দুই পাইলট দীর্ঘদিন কোনো ফ্লাইট চালাতে পারেননি। তাদের বোয়িং ৭৭৭-৩০০ উড়োজাহাজে পদোন্নতি দেয়ার কথা থাকলেও প্রায় এক বছর ধরে ফ্লাইট না দিয়ে বসিয়ে বসিয়ে বেতন-ভাতা দেয়া হয়েছে।
বিমান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, এ ঘটনায় বিমানের পরিচালক ফ্লাইট অপারেশনকে (ডিএফও) দায়িত্বে অবহেলার জন্য সরিয়ে দেয়া হতে পারে। এ নিয়ে ডিএফওর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের পাইলট ও কেবিন ক্রুদের পাঠানোর আগে তাদের সব ধরনের ক্লিয়ারেন্স নেয়ার কথা ডিএফওর। কিন্তু ডিএফও সেটা করেনি।
এক প্রশ্নের জবাবে ইমিগ্রেশন পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘটনার পরপরই আমরা তদন্ত শুরু করেছি। পাইলট যখন ইমিগ্রেশন পার হয়েছেন, তখন আসলে কী ঘটেছিল? ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা তার কাছে পাসপোর্ট চেয়েছিলেন কিনা? ওই সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।’
ইমিগ্রেশন পুলিশের বিশেষ শাখার পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ‘ঘটনার পরপরই আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। শুক্রবারের মধ্যেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা তদন্তের জন্য সবকিছুই আমলে নিয়েছি। তদন্ত প্রায় শেষ।’
জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঈদের দিন বিকালে আমরা রওনা হই। ঈদের দিন হওয়ায় সবাই ফেস্টিভ্যাল মুডেই ছিলেন। ইমিগ্রেশনে আমার পাসপোর্ট দেখতে চাইলে এ ভুলটি আর হতো না। আমি তখনই পাসপোর্ট এনে ফ্লাইটে যেতাম। আসলে আমি যেমন ভুল করেছি, ইমিগ্রেশনও ভুল করেছে।’
ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ কাতার থেকে টেলিফোনে সাংবাদিকদের আরও জানান, তিনি কাতারের ইমিগ্রেশনে আটক বা গ্রেফতার হননি। পাসপোর্ট না পেয়ে তিনি আর ইমিগ্রেশনেও যাননি। বিমানবন্দরের ভেতরে অরিক্স এয়ারপোর্ট হোটেলে ছিলেন। তিনি জানান, ৫ জুন রাতের ফ্লাইটে ঢাকা থেকে দোহায় যান তিনি। ঢাকায় শাহজালাল বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে তার দুই আঙুলের ছাপ নেয়া হয়। এরপর আর পাসপোর্ট দেখতে চাওয়া হয়নি।
গোপনে পাসপোর্ট পাঠানোর চেষ্টা : জানা গেছে বৃহস্পতিবার কাতার এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে সরকারের অনুমোদন ছাড়া গোপনে ফজল মাহমুদের পাসপোর্ট দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঠানোর চেষ্টা করে বিমানের এমডি ক্যাপ্টেন জামিল আহমেদ। কিন্তু কাতার এয়ারলাইন্স পাসপোর্ট বহনে অস্বীকৃতি জানায়। কাতার এয়ারলাইন্স জানায়, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া একজনের পাসপোর্ট বহনের নিয়ম নেই। পরে রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের বিমানে করে ফজল মাহমুদের পাসপোর্ট কাতার পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। রিজেন্ট এয়ারলাইন্সও পাসপোর্ট বহনে অস্বীকৃতি জানায়। এরপরই বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। অভিযোগ উঠেছে- এ ঘটনার পর বিমান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তোপের মুখে পড়েন বিমানের এমডি। পরে তিনি বাধ্য হয়ে বিষয়টি অফিসিয়ালি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানালে মন্ত্রণালয় থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাছ থেকে অনুমোদন নেয়া হয়। পরে ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ফজল মাহমুদের পাসপোর্ট কাতার পাঠানো হয়। রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া প্রথমে ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদের পাসপোর্ট বহন না করলেও পরে অনুমতি থাকায় পাসপোর্ট বহন করেছি।
পাইলট ফজল মাহমুদের ব্যক্তিগত গাফিলতি- পর্যটন সচিব : এদিকে পাসপোর্ট ছাড়া একজন পাইলট কীভাবে নিজ দেশের ইমিগ্রেশন পার হয়ে বিদেশ গেলেন তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। আইন অনুযায়ী পাসপোর্ট ছাড়া দেশত্যাগ ও অন্য দেশে প্রবেশের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মুহিবুল হক বলেন, বিষয়টি পাইলট ফজল মাহমুদের ব্যক্তিগত গাফিলতি। তিনি দেশে ফিরে আসার পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, মূলত শুক্রবার রাতে পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী উড়োজাহাজটি। ওইদিন গেছেন প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের কেবিন ও ককপিট ক্রুগণ। তাদের মধ্যে প্রধান পাইলট ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদের পাসপোর্ট ছিল না। এ কারণে কাতার ইমিগ্রেশন তাকে আটকে দিয়েছে। পরে পাসপোর্ট পাওয়ার পর ইমিগ্রেশন তাকে কাতারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। সচিব বলেন, ইতিমধ্যে ফজল মাহমুদকে প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে একজন অভিক্ষ পাইলটকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আনার জন্য শুক্রবার যে ফ্লাইটটি দোহা পাঠানো হয়েছে ওই ফ্লাইটে কাতার যাবেন। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফিরে আসার কথা রয়েছে। বিমান সচিব বলেন, ফজল মাহমুদের পাসপোর্টের বিষয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগের কর্মকর্তা ও ফজল মাহমুদ দুজনের ভুল ছিল। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে বলেও তিনি জানান। তার মতে শাস্তি হলে অভিযুক্তরা মনে রাখে কিন্তু শাস্তি না হলে কেউ মনে রাখেন না। তাই বিমান মন্ত্রণালয় থেকে এই ঘটনার শাস্তির বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করবে। এক প্রশ্নের জবাবে বিমান সচিব বলেন, এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি ফ্লাইট নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই।
ব্যবস্থা না নেয়ায় বারবার এমন ঘটনা : এর আগে পাসপোর্ট ছাড়া লন্ডন যাওয়ায় বিমানের একজন পাইলটকে বড় অংকের আর্থিক জরিমানা গুনতে হয়েছে। কিন্তু ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পাইলটের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ইমিগ্রেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যেকোনো দেশে ফ্লাইট নিয়ে যাওয়ার জন্য বিমানের ক্রুদের ভিসা নিতে হয় না। তারা একটি জেনারেল ডিক্লারেশন (জিডি) ফরম পূরণ করে ইমিগ্রেশন পার হন। ওই ফরমে সংশ্লিষ্ট পাইলটের নাম-ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বর, জন্ম তারিখ লেখা থাকে। নিয়ম হলো ওই ফরম নিয়ে পাইলট ইমিগ্রেশনে গেলে পুলিশ কর্মকর্তা তার পাসপোর্ট দেখে জিডিতে লেখা তথ্য হুবহু মিলিয়ে দেখেন। তথ্যের মিল থাকলেই কেবল তাকে দেশের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ আছে দীর্ঘদিন ধরে বিমানের একদল প্রভাবশালী পাইলট এসব নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করছেন না। তারা আগেই ফ্লাইটে চলে যান আর ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের জিডি ফরমটি ইমিগ্রেশনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বুধবারের ঘটনাটিও এমন কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ওই দিনের ভিডিও ফুটেজ নেয়া হয়েছে। ওই ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পাসপোর্ট ছাড়া কীভাবে শাহজালাল বিমানবন্দর ত্যাগ করেছেন তার উদ্ঘাটন চায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চার সদস্যের এ তদন্ত কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরাপত্তা ও বহিরাগমন) মো. আজহারুল হক। এ কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন- বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সেলিনা বানু ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসবির বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম। সুরক্ষা সেবা বিভাগের যুগ্মসচিব (বহিরাগমন-৪) মো. হেলাল মাহমুদ শরীফ কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটি প্রয়োজনে এক বা একাধিক সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাইলট ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ পাসপোর্ট ছাড়া কীভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করছেন তা উদঘাটন করতে বলা হয়েছে।
বিমান কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে ফজল মাহমুদ দেশে ফিরছেন ১০ জুন ভোরে : এদিকে শুক্রবার বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘কিছু সংবাদ মাধ্যমে দোহা ইমিগ্রেশন পুলিশ কর্তৃক বিমান পাইলট আটক বা গ্রেফতার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোটেও সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে সেখানে কোনো বিমান পাইলট আটক, গ্রেফতার বা আটকে দেয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পাইলট ফজল মাহমুদ বিমান কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে আগামী ১০ জুন ভোরে দোহা থেকে বিজি ১২৬ ফ্লাইট অপারেট করে ঢাকা আসবেন।
সূত্রঃ যুগান্তর