৬০ বন্দিশিবির থাই জঙ্গলে, ৫০০ মৃত্যু

indexthaiথাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি জঙ্গলে পাচারকারীরা ৬০টির মতো বন্দিশিবির গড়ে তুলেছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে। মালয়েশিয়া সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব বন্দিশিবিরে ৫০০-এর অধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের নাগরিক বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বন্দিশিবিরের পাশের গণকবর থেকেই গত শুক্র ও শনিবার ২৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ধরনের অসংখ্য গণকবর বন্দিশিবিরগুলোতে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে থাইল্যান্ডের জান্তা সরকার লোমহর্ষক এ মানবপাচারের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল সোমবার তিনজন থাই সরকারি কর্মকর্তাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরো কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়া হয়েছে। থাই সরকার তাঁদের বিচার করতে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের ‘বিতর্কিত’ ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহারের কথা জানিয়েছে, যাতে বিচারের ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
থাইল্যান্ডে অভিবাসী রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘রোহিঙ্গা অ্যাসোসিয়েশন অব থাইল্যান্ড’-এর সাবেক সভাপতি আব্দুল কালাম ব্যাংকক পোস্টকে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার সীমান্তজুড়ে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় পাহাড়ি জঙ্গলে পাচারকারীদের অন্তত ৬০টি বন্দিশিবির রয়েছে। তিনি বলেন, শংখলা প্রদেশের সাদাও জেলার ব্যান তালোহ জঙ্গলে যে ডিটেনশন ক্যাম্পের সন্ধান পাওয়া যায়, সেটা আসলে সাগরের বিশাল হিমশৈলের একটি ইঙ্গিত মাত্র। এ মুহূর্তে থাই-মালয়েশিয়া সীমান্তে অন্তত ৬০টি বন্দিশিবির রয়েছে। এর প্রতিটি শিবিরে ১৫০ থেকে ৮০০ জন বন্দি রয়েছে। গত মাসে দুটি বন্দিশালা থেকে দুই ব্যক্তি পালিয়ে এসে তাঁকে এ তথ্য দেয় বলে তিনি জানান। তারা দুজনই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা। পালিয়ে আসা এ দুই রোহিঙ্গাকে পাচারকারীরা মুক্তিপণের জন্য মারধর করত। তিনি বলেন, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সরকারের যৌথভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
এদিকে গত শুক্রবার গণকবরের পাশে বন্দিশালা থেকে জীবিত উদ্ধার বাংলাদেশি আনুজার ব্যাংকক পোস্টকে জানিয়েছেন, তাঁকে ওই বন্দিশিবিরে ৯ মাসে আটকে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি থাকা অবস্থায়ই সেখানে ৪০ জনকে মারা যেতে দেখেছি, যাদের মধ্যে ১০ জন ছিল বাংলাদেশি। বাকিরা ছিল মিয়ানমারের রোহিঙ্গা। তারা অনেকে অনাহার ও পুষ্টিহীনতায় মারা গেছে এবং কাউকে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি এখন বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই।’ তাঁকেও সেখানে মুক্তিপণ না পেয়ে নির্যাতন করা হয় বলে তিনি জানান।
তিনি জানান, দালালদের মধ্যে যাদের তিনি চিনতেন, তাদের একজন অরনুয়া। পুলিশ জানিয়েছে, গত বুধবার একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে একটি বন্দিশিবির থেকে সম্প্রতি পালিয়ে আসা কুরামিয়া নামের এক ব্যক্তি থাইল্যান্ডের পত্রিকা দি ন্যাশনকে জানান, তিনি বন্দি থাকা অবস্থায় এবং আসার পর অন্যদের কাছ থেকে যেসব তথ্য পেয়েছেন, তাতে সেখানে বিভিন্ন ক্যাম্পে অন্তত ৫০০ মানুষকে হত্যার কথা শুনেছেন। এসব বন্দিশিবিরে আটকে রাখা লোকজনের কাছ থেকে মুক্তিপণ হিসেবে লক্ষাধিক বাথ (থাই মুদ্রা) আদায় করা হতো। তিনি জানান, গত শুক্রবার যে বন্দিশিবিরের কাছে গণকবর থেকে ২৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, ওই ক্যাম্পে কাজিম নামে তাঁর এক ভাগ্নে ছিলেন। পাচারকারীরা ভাগ্নেকে উদ্ধারের জন্য ৯৫ হাজার বাথ দাবি করেছিল। এর পরও সেখানে দালালদের একজন আরনুয়া এবং তার লোকজন কাজিমকে পিটিয়ে হত্যা করে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ৯৫ হাজার বাথ দেওয়ার পর তারা আবারও এক লাখ ২০ হাজার বাথ দাবি করে। পরে তিনি সে অর্থও পাচারকারীদের কাছে পাঠান। এ সময় তিনি কেঁদে কেঁদে বলেন, এর পরও তারা কাজিমকে ফেরত দেয়নি। মৃত ২৬ জনের মধ্যে তাঁর ভাগ্নে কাজিমও ছিলেন। পরে এ বিষয়ে তিনি পুলিশকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
এদিকে থাইল্যান্ড সেনা সরকারের কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে থাই পুলিশ। তাঁরা হলেন স্থানীয় সিটি কাউন্সিলর আসান ইনতাতহানু (৪২), পাহাড়ি এলাকার ব্যান তালোহের গ্রামের উপগ্রামপ্রধান রোর-এন সোনায়েলা, সহকারী গ্রামপ্রধান অ্যালি লামোহ (৪৭) ও মিয়ানমারের নাগরিক জাউ নিয়াং আনু (৪০)। তাঁদের মধ্যে আসান ও সোনায়েলা ডিটেনশন ক্যাম্প পরিচালনা এবং অন্যরা নজরদারির কাজ করতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে গ্রামপ্রধানসহ আরো কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়া হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন। ইতিমধ্যে সেখানকার দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে মানবপাচারে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে থাই সরকার। এর অংশ হিসেবে গতকাল থাইল্যান্ডের পুলিশপ্রধান সম্যুত পুনপানমুয়ং এবং সেনাপ্রধান ও উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী উদিউমদেজসহ উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা সাদাও জেলার শনাক্ত হওয়া গণকবরটি পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে পুলিশপ্রধান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী (চ্যান ও-চা) আবারও আমাকে টেলিফোনে ঘটনার সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন। এর সঙ্গে জড়িত সব ধরনের ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।’
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন-চার বছর ধরে সীমান্তবর্তী জঙ্গলে পাচারকারীরা এসব বন্দিশিবির গড়ে তোলে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার নাগরিকদের সমন্বয়ে এই পাচারচক্রটি গড়ে ওঠে।
জীবিত ব্যক্তি বাংলাদেশি : এদিকে গত শুক্রবার শনাক্ত হওয়া গণকবরের পাশে বন্দিশালা থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় যে ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে তিনি বাংলাদেশি বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে ব্যাংককের বাংলাদেশ দূতাবাস। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক বিবিসিকে বলেছেন, রাষ্ট্রদূত তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তিনি নিজেকে বাংলাদেশি বলে দাবি করেছেন। আরো নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.